আলিঙ্গন দিবস
............................
প্রতিদিনের অভ্যাস, সকালে ঘুম থেকে দেরি করে উঠে খুব তাড়াতাড়ি অফিসের জন্য রেডি হয়েই ট্রেন ধরার জন্য দৌড়। বাইক মোটামুটি ভীড় রাস্তাতেও অনায়াসে ৫০ পার করে। আমি আর ট্রেন একই সাথে প্লাটফর্ম স্পর্শ করি। মাঝে মাঝে আবার চোর পুলিশের খেলা হয়। ও আমার একটু আগে এসে পরে আর প্লাটফর্ম ছুঁয়ে চলে যায়। সেদিন মহা ভোগান্তি আমার আর যারা আমার অপেক্ষায় থাকে, তাদেরও। সে নিয়ে নয় অন্য কখনো লিখব।
আমার ট্রেন সেই একই আছে। হবিবপুর থেকে ৯ টা ১০। ট্রেন খুব ফাঁকা থাকে, এটি বনগাঁ যায়। আর আজ আমারও গন্তব্য বনগাঁ অফিস। তাই আর নামার প্রশ্ন নেই, সোজা এক ট্রেনেই বনগাঁ চলে যাব। খুব আনন্দের জার্নি।
অভ্যাসবশেই ট্রেনে উঠেই মোবাইল খুলে ফেসবুক খুলে একটু চোখ বুলিয়ে নেওয়া। টাইমলাইন জুড়ে Hug Day নিয়ে লেখালেখি। খুব ভাল। আমার আবার কোনও দিনই ওই সব দিবস টিবস মনে থাকে না, আর যেহেতু জীবনে গুছিয়ে প্রেম করা হয়ে ওঠেনি, ওই সব দিন নিয়ে মাথাব্যথাও ছিল না, আর আমার কাছে কারো জড়িয়ে ধরার আব্দারও ছিল না। যাক সেসব কথা।
ট্রেন রানাঘাট থেকে বাঁদিকে টার্ন নিচ্ছে, বনগাঁর দিকে। ৩ নাম্বার প্লাটফর্ম স্পর্শ করল। আমি জানলার ধারে। ডান দিকে প্লাটফর্ম আর বাঁ হাতে অনেক ফাঁকা রেললাইন আর মালগাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। আমার চোখ মালগাড়ি গুলোকে দেখছে। একটি মালগাড়ির নীচে গিয়ে আমার দৃষ্টি স্থির হয়।
একটি ছোট্ট সংসার বলা যেতে পারে, সেই গাড়ির নীচে। তিনটি প্রানী, আর হ্যাঁ, তিনজন মেরুদন্ডী প্রানী, স্তন্যপায়ী প্রানী, দুপায়ে হাঁটে, হ্যাঁ, তিনজন মানুষের কথাই বলছি, দুজন নারী, আর একজন শিশু। পূর্নাঙ্গ নারীর বয়স আন্দাজ করতে পারলাম না। অপ্রাপ্তবয়স্ক নারীর বয়স আন্দাজ করি পাঁচ হবে, আর শিশুটির বছর দুয়েক। তারা ভাই বোন হবে৷ আশা করি। অপরজন তাদের মা হবে, আশা করি।
মা অসুস্থ, সেখানেই শুয়ে আছেন। আর সেই বছর পাঁচেকের দিদির কোলে ছোট্ট ভাই, খুব জোরে ভাইকে জড়িয়ে ধরে আছে। বোধহয় ঠান্ডার থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে। সামনে ঠোঙাতে কিছু খাবার, সেখান থেকে ভাইকে খাওয়াচ্ছে। আর ভাই যখন খেয়ে নিচ্ছে, দিদির মুখে অনাবিল খুশির হাসি। পরম তৃপ্তির হাসি। সাফল্যের হাসি। ভাইকে জড়িয়ে ধরে হামির পর হামি। আমি মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম।
ট্রেন আবার চলতে শুরু করেছে। যতক্ষণ ওদের দেখা যায়, আমি দেখার চেষ্টা করতে লাগলাম। আমাদের ফেসবুকের Hug Day এর সাথে ওদের আলিঙ্গন মেলানোর চেষ্টা করিনি। কেননা আমি ভেজাল আর নির্ভেজাল শব্দ দুটির সাথে পরিচিত।
না জানি এমন কত আলিঙ্গনে আমরা প্রতিনিয়ত আবদ্ধ হই আমাদের আপন জনের সাথে, প্রিয়জনের সাথে, সন্তানের সাথে, বাবা মায়ের সাথে, চেনা পরিচিত মানুষ জনের সাথে।
বেঁচে থাকুক সেই সব আলিঙ্গন, যা কিছু পারিবারের, বন্ধুত্বের, ভালোবাসার, প্রেমের, স্নেহের, ভরসার, বিশ্বাসের।
............................
No comments:
Post a Comment