Thursday, February 13, 2020

সবটা গল্প নয়।

সবটা গল্প নয়
..............................
একটি মেয়েকে প্রায়ই দেখতাম রানাঘাট স্টেশনে। না, রানু মন্ডলের গল্প নয়। একটি খুব ভদ্র, সংযত, গুছিয়ে থাকা মেয়ে, যথেষ্ট গম্ভীর, চোখে মুখে চিন্তার ছাপ, ক্লান্ত, কিছু একটা করার আপ্রান চেষ্টা, এমন একটি মেয়ে। আর পাঁচ জনের থেকে আলাদা ভাবে মেয়েটি আমার দৃষ্টি টেনে নিয়েছিল একটু আলাদা কারনে। সর্বদা মেয়েটির হাতে একটি বই থাকত। আর চোখ প্রায় সর্বদা বইয়ের দিকে , মাঝে মাঝে চোখ তুলে চারপাশটা একবার দেখে নিত। আজকাল তো বেশীরভাগ মানুষ মোবাইল নিয়েই ব্যস্ত থাকে, তাই এই ধরনের মানুষদের একটু ব্যতিক্রমী বলেই মনে হয়। 
 
আমি ব্যারাকপুর অফিস থেকে ৪টে ৩০ এ বেড়িয়ে ৪ টে ৫২ এর রানাঘাট লোকাল ধরতাম, সেটি রানাঘাট আসে প্রায় ৬ টা ১৫ -২০ নাগাদ। পরের শান্তিপুর লোকাল প্রায় ৭ টায়, আর মাঝের ৪০ মিনিট মত অপেক্ষা আর লোকজন দেখা ছাড়া আর কোনও কাজ থাকে না। আমার নিজেরও যাতায়াতের পথে বই পড়ার অভ্যাস তাই অন্য কাউকে বই পড়তে দেখলে আমারও খুব ভাল লাগে। 

আবার মেয়েটির কথায় আসি। সর্বদা পড়ছে। দূর থেকেই বুঝতে পারতাম চাকরীর পড়াশোনার জন্য কোনও ম্যাগাজিন পড়ছে। আর নিজে এত ম্যাগাজিন পড়ি বা পড়েছি যে ফন্ট আর প্রিন্টিং স্টাইল দেখেই বুঝে যাই যে কী পড়ছে। দেখলাম ও বাংলা অ্যাচিভার্স ম্যাগাজিন পড়ছে। সর্বদাই চুড়িদারে দেখেছি, মাথার মাঝারি মাপের চুল পরিপাটি করে বিনুনী করা। 

এতক্ষন যে কথাটি বলিনি, সেটি হল মেয়েটির চোখ যেমন সর্বদা বইয়ের দিকে থাকত, ঠিক সেই ভাবে একটি ছেলে সর্বদা ওর সাথে থাকত। একটি প্রানবন্ত ছেলে, সর্বদা হাসিখুশি, এই জীবন, বাস্তবতা, লড়াই, সংগ্রাম এসবের ধার ধারে না। বিন্দু মাত্র চিন্তা নেই। পরনে বেশীরভাগ দিন জিন্স – টিশার্ট, গালে যত্ন করে রাখা চাপ দাড়ি, মাথায় বড় বড় চুল, হাতে ব্যান্ড, আর সর্বদা বক বক করে যাচ্ছে। মেয়েটি কখনও মাথা নেড়ে, বা হ্যাঁ না বলে উত্তর দিচ্ছে, আবার পড়ছে। এই ভাবেই চলছিল, মাসের পর মাস, দুজনাই খুব খুশি, ছেলেটির প্রকাশ ছিল, মেয়েটির প্রকাশ ছিল না, মেয়েটি যেন একটু ভয় পেত, কেউ বুঝি দেখে ফেলল, আর জীবনে কিছু একটা করতে হবে, এমন একটা দৃঢ়টা ছিল চোখে মুখে। 

দৃশ্য – ১ 
..................।

রানাঘাট থেকে ট্রেনে উঠেছি, রাত ৭ টা, ঘটনাক্রমে ট্রেনে উঠে দেখি মেয়েটি আমার পাশে জায়গা নিয়ে দাঁড়িয়েছে, ছেলেটি তার পাশে, গেটের ধারে, গরম কাল, মেয়েটি পড়ছে, ম্যাগাজিন, অ্যাচিভার্স, বই থেকে মাথা তুলছে না। আর ছেলেটি গেটের ধারে, হাওয়ায় চুল এলোমেলো, অভ্যস্ত হাতে দ্রুত চুল ঠিক করছে। আর মাঝে মাঝে মেয়েটিকে কিছু একটা বলছে ইয়ার্কির সুরে, মেয়েটি পড়তে পড়তেই হাসছে। ছেলেটির সব কিছুতেই ইয়ার্কি, ট্রেনে হকার এলে তাদের নিয়েও কি একটা মন্তব্য করে মেয়েটিকে হাসাচ্ছে। মেয়েটি সব কিছুর মাঝেও পড়ে যাচ্ছে। চোয়াল শক্ত রেখে। 

এখানে বলে রাখি, মাসের পর মাস যা দেখেছি, তাতে বুঝেছি, ওরা রানাঘাটে একসাথে আসে না, কেননা মেয়েটিকে মাঝে মাঝে একাও দেখা গেছে অপেক্ষা করতে, পরে ট্রেনে ওঠার সময় আবার একসাথে দেখা গেছে। অর্থাৎ, ছেলেটি মেয়েটিকে নিতে আসত খুব নিয়ম মেনে, দায়িত্বশীলতার সাথে। 
যাইহোক, ট্রেন হবিবপুর এলে আমি নেমে যাই, এবং ওরা দুজনাই নেমে যায়। মেয়েটি বই বন্ধ করে ব্যাগে রাখে এবং ওরা দুজন প্লাটফর্মে নেমে বিপরীত দিকে হাঁটতে শুরু করে। ভাবটা এমন  যেন, ওরা দুজন একে অন্যকে চেনে না। 
মাসের পর মাস আমি এই ঘটনা দেখে এসেছি। 

দৃশ্য – ২
.....................

আমার রুটিন একই আছে। অফিস যাচ্ছি, ডাউন শান্তিপুর লোকাল, হবিবপুর থেকে ১০টা ২০ তে ছাড়ে। সেই মেয়েটি, বিবাহিতা, তার সেই মুখের কাঠিন্য, দৃঢ়তা, জেদ কিছুই চোখে পড়ল না, সব উধাউ হয়েছে। তার গাম্ভীর্য আজ অট্টহাসি এসে দখল করে নিয়েছে। সাথে স্বামী ছিলনা । দুজন মহিলা ছিলেন। মনে প্রশ্ন এল, তবে কি ওই ছেলের সাথেই বিয়ে করে নিল? উত্তর জানার উপায় ছিলা না। যে মেয়ের চোখ মাটি থেকে উঠত না, আজ তার চোখ পুরো কামরায় ঘুরছে। যে শরীর সংযত ছিল, আজ শরীর জুড়ে হাসির হিল্লোল। আমার অবাক হওয়ার পালা। যে মেয়েটি তার লড়াই, জেদ, দৃঢ়তার জন্য একটু হলেও আমার মনে সমীহ জাগিয়ে তুলেছিল, আজ তা ভাঙার পালা। 
মেয়েটির হাতে আজ আর বই ছিল না, শাঁখা, পলা, চুড়ি, আংটিতে ভরা ছিল আর দুহাত কনুই পর্যন্ত মেহেন্দি দিয়ে রাঙানো ছিল। ওরা রানাঘাট নেমে গেল, আর আমার যাত্রা ব্যারাকপুর পর্যন্ত বহাল থাকল। 

দৃশ্য – ৩
...........................

কয়েকমাস কেটে গেছে। আমার জীবন একই আছে। রানাঘাট থেকে ট্রেনে উঠেছি, রাত ৭ টা, বাড়ি ফিরছি, আমার মুখোমুখি সেই ছেলেটি, সেই স্টাইলিশ ছেলেটি। না, আজ আর সেই ছেলেটি প্রানবন্ত নেই, মুখে ক্লান্তি, চোখে বিষণ্ণতা, স্বাস্থ্য একটু ভেঙেছে। মাথার চুল ছোট করে কাটা, মুখে আর শখের দাড়িও নেই, পরনে সেই জিন্স – টিশার্ট, হাতে ব্যান্ড নেই। আর যেটি সবচেয়ে লক্ষণীয়, ছেলেটির হাতে বই। সেই বেপরোয়া ছেলেটি আজ যেন জীবনকে বুঝতে শিখেছে। আমার একটু কষ্ট হল। ছেলেটি আমাকে লক্ষ্য করছে, যে আমি ওকে দেখছি। এর আগেও আমি ওদের সাথে এক কামরায় বাড়ি ফিরেছি, চোখে চোখ পড়েছে, কথা হয়নি, তখন সাথে মেয়েটি ছিল, আজ একা, সাথে বই। 

আমার কী মনে হল, আমি ওর পাশে গেলাম, একটু হাসলাম, বললাম, 
- পড়ছ?
- হ্যাঁ, দাদা।
আমি ওর বইয়ের দিকে তাকালাম, দেখলাম মানোহর পান্ডের ১৪০০০+ পড়ছে। আবার বললাম, 
- কোথাও পড়ছ, না কি একাই?
- রানাঘাট জি.এস. সি. ই তে পড়ছি দাদা। 
- খুব ভাল, পড়ে যাও। 
এই বলে আমি ওর পিঠে হাত রাখলাম। 

সময় দেখার জন্য ও ফোন বের করল, আমি ওর ফোন আগেও অনেকবার দেখেছি, সেখানে মেয়েটির ছবি ওয়ালপেপারে রাখা ছিল। আজ দেখলাম, সেখানে মা সরস্বতী স্থান পেয়েছেন। ইতিমধ্যে হবিবপুর চলে এল, আমি নেমে গেলাম, ছেলেটিও নেমে গেল। 

দৃশ্য – ৪
..................... 

বছর দুয়েক পরে অফিস থেকে একটি প্রোগ্রাম আয়োজন করার জন্য স্থানীয় বিডিও অফিসে যেতে হয়েছিল। সেখানে বিডিও ছাড়াও অন্যান্য অফিসার, জেলা সভাপতি, পঞ্চায়েত প্রধানেরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান শুরু হলে বহু লোকের মাঝে ওই ছেলেটিকেও দেখতে পাই। আমার খুব কৌতুহল হল, ও এখানে কেন? তাহলে কি কোনও চাকরী পেয়েছে, না কি চাকরীর সন্ধানে সাধারন প্রার্থী হিসেবে এসেছে? ভিড় ঠেলে ওর কাছে চলে গেলাম, চোখে চোখ পড়তেই ও বলল,
- দাদা, তুমি এখানে?
- এটা তো আমাদের অফিসের ই প্রোগ্রাম।
- মানে তুমি এক্সচেঞ্জ থেকে এসেছ?
- হ্যাঁ, আর তুমি কেন এখানে? কাজের খোঁজে বুঝি?
এটা বলার পরে ও আমাকে একপ্রকার টানতে টানতে নিয়ে যেতে লাগল, 
- চলো, আমার ঘরে চলো।
- মানে তুমি বিডিও অফিসে চাকরী কর?
- আগে তো চলো।
অনেকটা ঘুরে ঘুরে বিরাট এক চেম্বারে নিয়ে গেল। 
- এই যে দাদা, এটা আমার ঘর। 
আমি নেমপ্লেট দেখলাম, যেখানে বড় বড় করে লেখা, মিঃ অর্নব বিশ্বাস, ব্লক ডেভেলপমেন্ট অফিসার। 
এই প্রথম ওর নাম জানলাম, সাথে পরিচয়। জড়িয়ে ধরলাম। 
- খুব ভাল হয়েছে ভাই, আমি ভীষণ খুশি হয়েছি। কেমন আছ বলো? 
- ভাল আছি দাদা। 
- অনেক দিন পরে তোমাকে দেখলাম।
- এখন আর হবিবপুর রেগুলার ফেরা হয় না দাদা। 
- সে তো বুঝেছি। 
এভাবে নানা কথার মাঝে জিজ্ঞেস করেই ফেললাম, বিয়ে করেছ? 
- না দাদা, করিনি, তবে দেখাশোনা চলছে। 
আরও নানা কথা বলে একরাশ ভাল লাগা নিয়ে বাড়ি ফিরে আসি। 

তবে মেয়েটির কথা তুলিনি, আর জানতেও চাইনি কিছু। যদি অন্য কোনও দিন মেয়েটির কথা জানতে পারি, সেদিন পঞ্চম দৃশ্যটি লিখে ফেলব।

No comments:

Post a Comment