Thursday, February 13, 2020

প্রমিস ডে

প্রমিস ডে
......................

৯ টা ১০ এর বনগাঁ লোকালে হবিবপুর থেকে উঠেছি, সাড়ে ন'টা নাগাদ রানাঘাট স্টেশনে নেমেছি। এখান থেকে ৯ টা ৪১ এর গেদে লোকাল ধরে ব্যারাকপুর যাব, তাই মাঝের যে ১০ মিনিট সময়, জায়গা খুঁজে,  একটু ফাঁকা দেখে দাঁড়িয়ে আছি। 

সামনে একটি ছেলে, ২৮ - ৩০ বয়স হবে, পরনে বারমুডা, গায়ে গোল গলা গেঞ্জি, সাথে ব্যাগ ভর্তি লাল গোলাপ। এক ব্যাগ থেকে বের করে জল ঝেড়ে ফেলে আবার অন্য ব্যাগে রাখছে। গুছিয়ে রাখছে, খুব যত্ন করে রাখছে, মাঝে মাঝে হাতে কাঁটা বিঁধলে হাত দেখছে। আর পুরো ব্যাপারটি আমি দেখছি। 

ওর সব কাজ যখন প্রায় শেষ,  ওর সামনে গেলাম, 

- কোথায় নিয়ে বসবে এগুলো? 

ও কাজ করতে করতেই পাত্তা না দেওয়ার মত করে বলল, 
- ওই তো, ওই ব্রিজের ওপর।
- কত গুলো ফুল আছে এখানে? 
- প্রতি বান্ডিলে ১০০ করে।
আমি দেখলাম, প্রায় ১৫ বান্ডল ফুল আছে ওর কাছে। 
- কত করে বিক্রি করবে?
- সব এক দাম না, শেপ আর সাইজ দেখে বিক্রি হবে, এগুলো আবার আলাদা করতে হবে। ১০, ১৫, ২০ যেটা যেমন হবে, তেমন দামে বিক্রি হবে। 
কিছু আবার পাইকারী দরেও বিক্রি হবে। 

এবার আমার প্রশ্নের খেলা শুরু। ভিতরের মানুষটিকে জানার প্রশ্ন। 

বলে ফেললাম,
- তুমি কাউকে গোলাপ দেবে না?
এবার ছেলেটি হেসে ফেলল। একটু চুপ করে থাকল।  তারপর বলল, 
- আমিই তো দাদা সবাইকে ফুল দেই।
- সেই দেওয়ার কথা বলছি না।

বুঝেও না বোঝার ভান করছে। 
আবার বললাম, 
-বিশেষ কেউ নেই তোমার? 
- সব খরিদ্দারই আমার কাছে বিশেষ ,  দাদা। আমার ব্যবসা টাই সব। ভাল ব্যবসা হলেই আমার কাছে এটি বিশেষ দিন, আর কিছু বুঝি না। 

এবার আমার চুপ থাকার পালা। আমি কি কথায় হেরে যাচ্ছি? হ্যাঁ, হেরে গিয়েও ভাল লাগছে, যার জীবনবোধ আছে, সঠিক মূল্যায়ন আছে, জীবনকে ভিন্ন ভাবে দেখার সাহস আছে, তার কাছে হেরেও আনন্দ পাই। 

আবার বোকার মত, শুধু মাত্র কথা বাড়ানোর জন্যই  বললাম, 
- খুব কাঁটা ফুলগুলোতে।

সে আমাকে অবাক করে উত্তর দিল,

- সে যন্ত্রনা তো শুধু আমি পাই দাদা। প্রতিটি ফুল আমাকে কেটেছেঁটে পরিষ্কার করে, রাংতা মুড়ে বিক্রি করতে হয়। কাঁটার খোঁচা, সে শুধু আমিই পাই। যারা কেনে, আর একে অন্যকে গিফট করে, তারা এ যন্ত্রণা কিভাবে জানবে?  

আমার ট্রেন আসছে। আমি ছেলেটিকে পিছনে ফেলে এগিয়ে গেলাম। যাওয়ার সময় বলে এলাম, 

-ভাল থাকবে। তোমার সাথে কথা বলে খুব ভাল লাগল। প্রার্থনা করি, তোমার সব ফুল বিক্রি হয়ে যাক। 

ছেলেটি একগাল হাসি উপহার দিল। 

একটা মিশ্র অনুভূতি নিয়ে ট্রেনে উঠলাম। সত্যিই তো, ওর প্রমিস জীবনের কাছে, জীবনকে কালকের থেকে আরও একটু ভাল রাখার প্রমিস, সমৃদ্ধ হওয়ার প্রমিস, একটু ভাল ভাবে সংসার চালানোর প্রমিস, বৃদ্ধ বাবা মায়ের দেখাশোনা করার প্রমিস, প্রিয়জনের জন্য সস্তা শাড়ী নিয়ে যাওয়ার প্রমিস, ছোট্ট বাচ্চার জন্য সস্তা খেলনা কিনে নিয়ে যাওয়ায় প্রমিস, আর নিজের ইচ্ছে,  ভালোলাগা, না পারার যন্ত্রণা,  অক্ষমতা,  সীমাবদ্ধতা ভুলে থাকার প্রমিস। 

এই সকল প্রমিসের কাছে, আমাদের শখের প্রমিস ডে, ধারেকাছেও আসছে না। 

এবার আমার উদাস হওয়ার পালা।

ট্রেন ছুটছে, আমি জানলার ধারে। চোখটা জ্বলছে।  

.............

No comments:

Post a Comment