সবটা গল্প নয় ( বাকি অংশ)
.............................
কথা ছিল যদি কখনও মেয়েটির সন্ধান পাই, সেদিন পঞ্চম দৃশ্যটি লিখে ফেলব। আজ সেটি লিখে ফেলার সময় এসেছে। যে মেয়েটিকে শুধুমাত্র বিবাহিতা অবস্থায় ট্রেনে দেখেছিলাম, যার নাম, ঠিকানা কিছুই জানতাম না, তার খোঁজ পাওয়া মোটেই সহজ ছিল না। তার সন্ধান কিভাবে পেলাম, শুধু সেটি নিয়েই আরেকটি গল্প লেখা যায়।
ছুটির দিনে বিছানায় আধশোয়া হয়ে ফেসবুক দেখছিলাম, অনেকগুলো ফ্রেন্ড সাজেশন ঘুরছিল। স্ক্রোল করে দেখতে দেখতে একটি মেয়ের ছবিতে চোখ আটকে যায়, না, সে আমার গল্পের মেয়ে নয়, অন্য মেয়ে, তার সাথে আমার দশটি কমন ফ্রেন্ড আছে। আমি তার প্রোফাইল খুলি, স্বাভাবিক আগ্রহবশেই খুলি শুধুমাত্র দেখার জন্যই। কিছু খোঁজার মন নিয়ে খুলিনি। সেই মেয়েটিরও বাড়ি হবিবপুর। মেয়েটির ফটো সেকশন খুলে দেখতে দেখতে অনেক পিছনের দিনে চলে যাই, প্রায় পাঁচ ছ বছর পিছনে চলে যাই। সেখানে রানাঘাট কলেজের সরস্বতী পূজার সময় মেয়েটির কিছু গ্রুপ ছবি দেখতে পাই, মেয়েদের গ্রুপ, প্রায় দশ –বারো জনের গ্রুপ। সেই ছবি জুম করে দেখতে থাকি।
অবাক কান্ড। সেই গ্রুপে আমার গল্পের মেয়েটিকে দেখা যায় হলুদ শাড়িতে, খুব সাধাসিধে ভাবে, সবার থেকে আলাদা মুডে। আর সবাই যেমন ছবি তোলার সময় মুখ বাঁকিয়ে, ঠোঁট বাঁকিয়ে, কেউ বা জিভ বের করে, কেউ বা চোখ বাঁকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আমার গল্পের মেয়েটি সেখানে নিছক বেমানান হয়ে ভদ্র ভাবে হাল্কা হাসিতে দাঁড়িয়ে আছে। আজকালকার এই ধরনের চোখ মুখ বাঁকানো মেয়েদের দুষ্টু ছেলেরা পোলিও খাওয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়। আমারও যে মনে হয়না, সেটা বলছি না, তবে চুপ থাকাই শ্রেয় মনে করেছি। না হলে হয়ত, অনধিকার চর্চা বা মানবাধিকার লঙ্ঘন করার দায় নিতে হবে। যাক সে কথা।
আমি সেই ছবির স্ক্রীনশট নিয়ে রাখি আর আমার মিসেস কে দেখাই। কেননা, সেও হবিবপুরের মেয়ে, সেও ২০১৩ তে এম.এ. পাশ করেছে, কল্যানীতে পড়েছে, এলাকার মেয়ে হিসেবে হয়ত চিনতে পারবে, এই আশায় তাকে ছবিটি দেখাই। মিসেস তিন চারজন মেয়েকে চিনতে পারল। আমার আগ্রহ, আমার গল্পের মেয়েটিকে নিয়ে, না, সে তাকে চিনতে পারল না, বলল, মাঝে মাঝে হয়ত বা দেখেছে, কিন্তু ঠিক গল্পের মেয়েটির পাশের মেয়েটিকে চিনতে পারল। আমি বললাম,
- পাশের মেয়েটিকে চিনতে পারছ?
- হ্যাঁ, এই মেয়েটিকে চিনি।
- হবিবপুরে থাকে?
- হ্যাঁ গো, তুমি যে কাকুর থেকে ওষুধ আনো, ওই যে বাজারে দোকান, সেই কাকুর ছোট মেয়ে।
- তোমার সাথে পড়ত?
- না, ও আমার থেকে ছোট, ওর দিদি আমার সাথে পড়ত।
- আর এই মেটিকে চিনছ না? এই যে হলুদ শাড়িতে?
- দেখেছি মনে হচ্ছে, কিন্তু আমাদের এই দিকটায় থাকে না মনে হচ্ছে। তুমি ওই কাকুকে একবার জিজ্ঞেস করতে পারো।
দিন দুয়েক পরে আমি ওষুধ নিতে কাকুর দোকানে গেলাম। আমার সাথে ভাল পরিচয়, সবসময় তার কাছে যাই, কথায় কথায় বলেই ফেলি,
- কাকু, তোমার মেয়েরা চাকরি-বাকরি কিছু পেল?
একটু অবাক হল। আমার সাথে শুধু ওষুধ নিয়েই কথা হয়, আজ এই আচমকা প্রশ্নে তাকিয়ে রইল, কিছুক্ষন।
- তোমার বড় মেয়ে আর আমার মিসেস স্বপ্না তো একসাথেই পড়ত শান্তিপুর কলেজে, তাই না?
- হ্যাঁ, হ্যাঁ, ওর তো বিয়ে হয়ে গেছে। আর চাকরির চেষ্টা করেনি।
- আর ছোট জন?
- ও ইংলিশ এ এম.এ. করেছে, বি.এড. করছে। টিচার হওয়ার ইচ্ছে।
- তোমার ছোট মেয়েকে আমি দেখেছি।
- হ্যাঁ, ও তো মাঝে মাঝে দোকানে বসে।
- আমি দোকানে দেখিনি, তবে ফেসবুকে দেখেছি।
- ও আচ্ছা।
বলেই আমি পকেট থেকে মোবাইলটি বের করে ছবিটি দেখাই।
- এই দেখো , কাকু।
- এ তো অনেক আগের, কলেজের মনে হচ্ছে।
- হ্যাঁ, কাকু।
এবার আমার আসল উদ্দেশ্যে চলে এলাম। বলে ফেললাম,
- আচ্ছা কাকু, এই হলুদ শাড়ি পরা মেয়েটিকে চেনো?
- দেখি।।
কাকু ভাল করে দেখলো।
- হ্যাঁ, চিনি তো, আমাদের পাড়াতেই থাকে। আমার মেয়ের সাথেই পড়ত। ওর তো বিয়ে হয়ে গেছে।
- নাম কী কাকু, মেয়েটার?
- আমরা তো ওকে তিতলি বলে ডাকি, খুব ভাল মেয়ে,ও, আমাদের বাড়িও আসত, তবে ওর একটা ভাল নামও আছে। ভুলে গেছি।
- কোথায় বিয়ে হয়েছে কাকু?
- ওর বেলঘড়িয়ায় বিয়ে হয়েছে।
ইতিমধ্যে কিছু কাস্টমার দোকানে এসেছে, আমাদের কথাবার্তা সাময়িক বন্ধ থাকল। আবার ফাঁকা পেলাম,
- কাকু, ওর বর কী করে?
- ওই মেডিক্যাল লাইনেই আছে।
- ডাক্তার নাকি?
- না, ঠিক ডাক্তার না, আবার কম কিছুও না।
- মানে?
- টেকনিশিয়ান গোছের, তবে খুব উঁচু পোষ্টে কাজ করে।
- তুমি কি জানো, কোথায় চাকরি করে?
- যখন বিয়ে হয়, তখন খড়দায় সুরক্ষাতে চাকরি করত। ওরা তো আবার ছেড়ে অন্য জায়গায় চলেও যায়, এখন কোথায় আছে জানি না।
- বিয়ের পরে এখানে আসেনি?
- হ্যাঁ, দু একবার এসেছেও। পূজাতে এসেছিল তো।
- ও আচ্ছা।
- তা তুমি এই মেয়েটার কথা শুনছ কেন? চেনো নাকি?
- না কাকু, চিনি না, তোমার মেয়ের সাথে দেখলাম, তাই জিজ্ঞেস করলাম। স্বপ্না ওর কথা বলছিল, বলল, তুমি হয়ত চিনবে, তাই আর কি।
- ও।
- আসি তাহলে কাকু।
এই বলে চলে এলাম। মোটামুটি একটা ধারনা পেলাম। ডাকনাম পেলাম, শ্বশুরবাড়ির অবস্থান পেলাম, স্বামীর স্ট্যাটাস পেলাম। তবে এইটুকুই যথেষ্ট ছিল না। আমার জানার আগ্রহ ছিল, তিতলি ব্যক্তিগত জীবনে কোথায় গিয়ে পৌছল।একবার, তিতলির মুখোমুখি দাঁড়ানোর ইচ্ছে আছে। দেখা যাক, আমিও কোথায় গিয়ে থামি।
ঘটনাক্রমে একদিন তিতলির মুখোমুখি দাঁড়ানোর সুযোগ পেয়ে যাই। এবার আসব সেই ঘটনায়।
দৃশ্য – ৫
.......................................
আমার বাবার বয়স হয়েছে, প্রায় ৭২ হবে, কোমরে সমস্যা, খুব ব্যথা, সেখান থেকে বাঁ পায়ে সমস্যা, দাঁড়াতে পারে না, হাঁটু আপনা আপনি ভেঙে বসে পরে। প্রথমে অর্থপেডিক দেখানো হল, নৈহাটিতে, তারপরে নিউরোসার্জন দেখানো হল, সেটাও নৈহাটিতেই। অনেক রকম টেস্ট, দীর্ঘদিনের চিকিৎসা ও ফিজিওথেরাপির পর বাবা মোটামুটি সুস্থ। সে সব বিস্তারিত কথায় যাচ্ছি না। কিন্তু এটুকুর সাথে আমার গল্পের যোগ আছে, তাই লিখতেই হল।
অর্থোপেডিক ডাক্তার কোমরের এম.আর.আই. করতে দিয়েছিল আর সাথে খড়দাতে সুরক্ষায় যাওয়ার সুপারিশ করেছিল। যে সময়ের কথা বলছি, তখন নৈহাটিতে কোথাও এম.আর.আই. করানো হত না, কাছাকাছি ছিল কল্যানীতে, খরছ ছিল ছয় হাজার টাকা, কিন্তু ডাক্তারের সুপারিশে খড়দা থেকে করালে খরচ হবে আড়াই হাজার টাকা, তাই খড়দা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। তখন বাবা হাঁটতে পারে না, আমি আর আমার মিসেস বাবাকে নিয়ে গাড়ি ভাড়া করে সোজা খড়দা সুরক্ষা তে, যেখানে আমার জন্য অবাক হওয়ার পালা অপেক্ষা করছিল। সাথে কিছুটা বেদনা।
সুরক্ষায় ঢুকেই বাঁ হাতে রিসেপশন, সেখানে তিনজন সুসজ্জিত, স্মার্ট, দক্ষ মহিলা কাজ সামলাচ্ছেন। আর তাদের মাঝে একটি মহিলা আমার গল্পের তিতলি।ও ঠিক মাঝে রয়েছে, আর ঘটনাক্রমে ওর কাছেই লাইন কম ছিল, আমি বাবা আর মিসেসকে বসিয়ে লাইনে দাঁড়াই, আমার লাইন আসে, আমি তিতলির মুখোমুখি, যার সাথে কখনও কথা বলনি, আজ তার সাথে প্রথম কথা। তার সেই আগের গাম্ভীর্য আবার ফিরে এসেছে, এবার যেন অনেক বেশি দায়িত্ববান, অনেক বেশি নিষ্ঠা। আমি লাইনে দাঁড়িয়ে তার গতিবিধি, নড়াচড়া, কথাবলা, তাকানো সবই লক্ষ্য করছিলাম কিন্তু সে নিজেকে এতটাই ঢেকে রেখেছিল তার গাম্ভীর্য দিয়ে, আমি ঠিক পড়তে পারছিলাম না। তার দু চোখ খুব মন দিয়ে দেখছিলাম, খোঁজার চেষ্টা করছিলাম, সে কি এটাকেই তার শেষ গন্তব্য বলে মেনে নিয়েছে, নাকি আজও সেই কিছু করার জেদ কিছুটা অবশিষ্ট আছে। আমার মন বলছিল, সে এটাকেই তার গন্তব্য বলে মেনে নেয়নি, সেই মেয়ে শেষে একজন সাধারন রিসেপশনিস্ট হয়ে বাকি জীবন কাটাতে পারে না। আমার মন বলছিল, সে ভিতরে ভিতরে আজও নিজের সাথে লড়ছে।
এইসব ভাবতে ভাবতেই আমি তিতলির গলার আওয়াজে সম্বিৎ ফিরে পেলাম।
- আপনার বুকিং নাম্বার টি কত স্যার?
- ফরটি সিক্স ম্যাম।
- পেসেন্টের নাম?
- মহাদেব হালদার।
- বিলিং অ্যাড্রেস টি বলবেন প্লিজ।
আমি সব কিছু বলে, ক্যাশ জমা করে দিলাম। সে বলল,
- এম.আর.আই. ছিল, ফরটি ফোর ঢুকেছে, আপনারা প্লিস বসুন, আমরা অ্যানাউন্স করব।
- থ্যাঙ্ক ইউ ম্যাম।
এই বলে আমি বাবার পাশে গিয়ে বসি। আর অপেক্ষা করতে থাকি। বুঝে যাই অন্তত ঘন্টা খানেক অপেক্ষা করতে হবে। কেননা একটা এম.আর.আই. করতে প্রায় আধ ঘন্টা সময় লাগেই। নিজের হাঁটুর এম.আর.আই. করার সময় প্রায় চল্লিশ মিনিট ঠান্ডা ঘরে কম্বল চাপা দিয়ে শুয়ে থাকতে হয়েছিল। সেখান থেকেই সময়ের আন্দাজটি পেয়েছি।
এখানে তিতলির দেখা পেয়ে আমি একসাথে অবাক, খুশি, আবার ব্যথিত। ওর বর্তমান পরিস্থিতি আমার ঠিক সুবিধার মনে হচ্ছিল না। ওর সাথে কথা বলার জন্য খুব আগ্রহী ছিলাম।
ওকে একবার সিঁড়ি দিয়ে ওপড় তলায় যেতে দেখলাম, একটু ভারী হয়েছে, বোঝা যাচ্ছে। আর একবার এম.আর.আই. রুমে গিয়ে কিছুক্ষন থেকে এল। ওর ফেরার পথে ওর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম, বলে ফেললাম,
- এক্সকিউজ মি, ম্যাম।
- হ্যাঁ বলুন।
- আপনার সাথে দুটো কথা বলা যাবে?
- হ্যাঁ, বলুন।
- আপনি কি ম্যাডাম, হবিবপুর থাকতেন?
- হ্যাঁ, কেন বলুন তো?
- না। আসলে আমিও হবিবপুর থাকি তো, তাই আর কি।
- কিন্তু আপনার বিলিং অ্যাড্রেস যে নৈহাটি দেখলাম!
- হ্যাঁ, ম্যাম, আসলে আমার নিজের বাড়ি নৈহাটিতেই, আর আমার মিসেসের বাড়ি হবিবপুরে।
- ও আচ্ছা।
এই বলে সে চলে যেতে উদ্যত হল। আমি জানি এই সুযোগ হয়ত আর পাবো না, তাই একনাগাড়ে বলে গেলাম,
- আমি ম্যাম অনেক আগে আপনাকে রানাঘাট স্টেশনে আর ট্রেনে বই পড়তে দেখতাম, সেখান থেকেই আপনাকে চিনি।
মেয়েটি চলে যেতে গিয়েও থেমে গেল। এক মুহূর্তের জন্য চোখ নামিয়ে নিল। মুখে হাল্কা মেকআপ করা থাকলেও মুখের বদলে যাওয়া রঙ আমার চোখে ধরা পড়ল। মুখের হাল্কা হাসিটিও মিলিয়ে গেল । সামলে নিয়ে বলল,
- ও, আচ্ছা। সে তো অনেক দিন আগের কথা।
- হ্যাঁ, ম্যাম, সেখান থেকেই চিনি। কিছু যদি মনে না করেন, আপনার নামটি জানতে পারি কি?
একটু ইতস্তত করেও বলল,
- অনন্দিতা রায়।
আমি মনে মনে হিসেব করে নিলাম, অর্ণব আর অনিন্দিতা, কী সুন্দর মিলত। আজ দুজন, কে কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে।
- তাহলে ম্যাম, আপনি এখন এখানেই জব করছেন।
- হ্যাঁ, এখানেই আছি।
- আর গভমেন্ট জবের জন্য চেষ্টা করছেন না?
আবার সেই শক্ত চোয়াল। উত্তর এল,
- না, আর করছি না।
আমার মন অন্য কথা বলছিল, এ মেয়ে ছাড়েনি, চেষ্টা চলছে, কিন্তু প্রকাশ করছে না। নিশ্চয়ই অন্য কোনও গল্প সৃষ্টি হয়েছে। বললাম,
- ও, আচ্ছা ম্যাম, আর ম্যাম আপনার হাসব্যান্ড?
এই কথা বলায় সে আরও গম্ভীর হয়ে যায় আর বলে,
- আপনি প্লিজ বসুন, কাউন্টারে লাইন পড়েছে।
এই বলে চলে যায়। তার যাওয়ার পথেই বলি,
- থ্যাঙ্ক ইউ, ম্যাম, আর আপনার সময় নষ্ট করার জন্য সরি।
- প্লিজ, আপনি বসুন।
সে আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছে। আর কথা বলতে চায় না। আমিও গিয়ে বসলাম। কিন্তু ভেবে নিলাম, আরও কিছু জানব। যথা সময়ে বাবার ডাক আসল। আমি আর মিসেস গিয়ে রুমের সামনে দাঁড়ালাম, আমি বাবাকে নিয়ে রুমে গেলাম, খুব ঠান্ডা ঘর, এক সৌম্যদর্শন যুবক, বয়স আন্দাজ করি ৩৫ – ৩৬ হবে। যথেষ্ট উচ্চতা, ফর্সা, কোয়ালিফায়েড পার্সন, কম্পিউটারের সামনে বসে আছে, ডাক্তারের পোশাক, আমার দিকে তাকিয়ে বলল –
- প্লিজ, সিট হেয়ার।
আমি ওনার থেকে একটু দূরে থাকা চেয়ারে বসলাম, সেই ঘরের মধ্যে দিয়ে আরেকটি কাঁচে ঘেরা ঘরে বাবাকে নিয়ে গেল একজন নার্স, প্রসেস শুরু হলে আমি বাইরে চলে আসি, বাইয়ে মিসেস অপেক্ষা করছিল।
আমি আর মিসেস একটু হাঁটাচলা করতে লাগলাম আর মেয়েটির কথা বললাম ওকে। ও দূর থেকে মেয়েটিকে দেখল, আর বলল, এই তোমার গল্পের মেয়ে? তা কথা হল কিছু?
- হ্যাঁ, মোটামুটি হয়েছে, যাওয়ার আগে আবার একবার দেখা করার ইচ্ছে আছে। দেখি , কথা বলা যায় কিনা!
বাবার টেস্ট হয়ে গেছে, এবার বাড়ি ফেরার পালা। সবে তিনজন উঠে দাঁড়িয়েছি, এমন সময় মেয়েটি আবার কাউন্টার ছেড়ে বাইরে এসেছে। আমি সামনে গিয়ে বললাম,
- ম্যাম, আর একটি কথা!
ডান হাত তুলে বলল,
- প্লিজ, আর কোনও কথা নয়। ব্যস্ত আছি।
এই বলে চলে যাচ্ছিল। আমি দূর থেকেই বললাম,
- ম্যাম, আপনি অর্ণব বিশ্বাস কে চেনেন?
আন্দাজ ছিল, এই নামটি এড়িয়ে যাওয়া তিতলির পক্ষে সম্ভব হবে না। ঘুরে দাঁড়ায়, বলে-
- কী নাম বললেন আপনি?
- অর্ণব বিশ্বাস।
- আপনি চেনেন তাকে?
- হ্যাঁ, আপনার সাথেই দেখেছিলাম।
- আপনার সাথে কথা হয়েছে কখনও?
- হ্যাঁ, বলেছি।
- কোথায় থাকে এখন?
- দমদমে ফ্ল্যাট নিয়েছে।
- কী করছে এখন?
- বি.ডি.ও.
- ওর কন্টাক্ট ডিটেলস আছে?
- না, নেই।
তিতলি এই কথা গুলো একনাগাড়ে বলে গেল, ওর শ্বাসপ্রশ্বাসের গতি বেড়ে গেছে, ওর চোখে আগ্রহের ছাপ। কিছুটা যেন উতলা হয়েছে। চাপা ছিল বোধহয়। না হয় ইচ্ছে করে , না হয় বাধ্য হয়ে চেপে রেখেছে। আজ বুঝি আমি কিছুটা মুক্ত করার সুযোগ দিলাম। সামলে নিল নিজেকে দ্রুত। বলল,
- ও আচ্ছা।
বলে অপ্রস্তুত হেসে ফেলল। আমিও সুযোগ বুঝে জিগ্যেস করে ফেললাম,
- আপনার হাসব্যান্ডের কথা জানা হল না, ম্যাম।
এবার মেয়েটি কিছুটা পরিচিত মানুষের মত আচরণ করল। বলল,
- এম.আর.আই. রুমে যাকে দেখলেন, তিনিই আমার হাসব্যান্ড। ডক্টর সায়ন্তন বোস। তার সুবাদেই এখানে চাকরি। একসাথে আসি আর একসাথেই বাড়ি ফিরি।
আমার যাওয়ার সময় হয়ে এসেছিল। বললাম,
- এটা খুব ভালো ব্যাপার, ম্যাম।
- তা ঠিক, বলে হাসল।
- থ্যাঙ্ক ইউ ম্যাম, তাহলে আসি।
- আর হ্যাঁ, আপনি কাল বিকেলেই রিপোর্ট পেয়ে যাবেন।
- আচ্ছা ম্যাম।
এই বলে সুরক্ষা ত্যাগ করলাম।
একটি জানা সম্পূর্ন হল। মনে হচ্ছিল, এই গল্পের এখানেই শেষ নয়, তিতলির চোখ অন্য কথা বলছিল। ওর সেই জেদ, সংকল্প, দৃঢ়তা আমি দেখেছি, এই মেয়ে নিশ্চয়ই ওর স্বপ্ন পূরনের জন্য লড়ছে, হ্যাঁ, আজও লড়ছে। ও রিসেপশনিস্ট হয়ে জীবন কাটানোর মেয়ে নয়।
যে প্রশ্নগুলোর আজও উত্তর পেলাম না, যেমন, ও কেন বিয়ে করে নিল অন্য ছেলের সাথে, কেন পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে প্রাইভেট জব করছে, অজানাই থেকে গেল।
যদি কোনওদিন এই সব প্রশ্নের উত্তর পাই আর মেয়েটির সাফল্যের কথা কোনওভাবে জানতে পারি, সেদিন এই গল্পের ষষ্ঠ দৃশ্যটি লিখে ফেলব।
......................................................