Sunday, November 22, 2020

সবটা গল্প নয় ( ষষ্ঠ দৃশ্য) ==================

সবটা গল্প নয় ( ষষ্ঠ দৃশ্য) 
==================

পঞ্চম দৃশ্য পর্যন্ত ঘটে যাওয়া বিষয় গুলো এমন - অর্নব বিশ্বাস লেখাপড়া করে বিডিও হয়েছে, এখনও অবিবাহিত আর তার ভালোবাসার মানুষ তিতলি ওরফে অনিন্দিতা রায় বিয়ে করেছে সায়ন্তন বসু নামের একজন ডাক্তারকে। 
পড়াশোনায় খুব নিষ্ঠা থাকা ও জীবনে সফল হওয়ার চেষ্টায় থাকা মেয়ে তিতলি বিয়ের পরে সুরক্ষায় রিসেপশনিস্ট হিসেবে কাজ করছে। তার সফল হওয়ার স্বপ্ন, স্বপ্নই থেকে গেছে। অপরদিকে, যার সফল হওয়ার কথাই ছিল না, সেই অর্নব, তিতলিকে হারিয়ে ভীষন ভাবে পরিবর্তিত হয়ে যায়, আর কঠোর পরিশ্রম ও সাধনার জোরে সে আজ সফল বিডিও। 

তাহলে কী তিতলি তার বাকি জীবন এক সাধারণ গৃহবধূ হয়েই থাকবে? রিসেপশনিস্ট এর কাজই কী তার গন্তব্য ছিল? সে যে খুব উচ্চাকাঙ্খী মেয়ে, আমি যে তার চোখে অন্য কিছু দেখে এসেছি। 

আমি অর্নব আর তিতলির কথা ভুলেই গেছিলাম। নিজের অফিসের কাজকর্ম আর লেখাপড়া,  গানবাজনা করেই সময় কেটে যাচ্ছিল। ওরা আমার মন থেকে মুছেই গিয়েছিল। 

কিন্তু কথা দিয়েছিলাম, যদি কোনও দিন তিতলির সাফল্যের গল্প জানতে পারি সেদিন এই গল্পের ষষ্ঠ দৃশ্য লিখে ফেলব। 

ষষ্ঠ দৃশ্য 
===============
===============

ঘটনার সূত্রপাত এভাবে। আমার বরাবর ইউটিউব দেখার অভ্যাস, বিশেষ করে Motivational Video, Success Story খুব দেখি। আর UPSC Topper দের Mock Interview,  তাদের Journey, Successful candidates দের interview এসব দেখা আমার প্রায় প্রতিদিনকার সাধারণ কাজে পরিনত হয়েছে। এভাবেই একদিন ভিডিও দেখতে দেখতে একটি Success Story সামনে আসে। 

কার স্টোরি, কিচ্ছু জানি না। অভ্যাসবশত দেখছি।  তো, সেই ভিডিওটি ছিল Dristi IAS Centre এর সফল candidate দের নিয়ে। অনুষ্ঠানের শুরুতে সঞ্চালক বলছেন - 

- প্রতিবছর আমাদের একাডেমি থেকে বেশ কিছু ছাত্র ছাত্রী সফল হন। তারা সকলেই যে মেধাবী, তা নয়, কিন্তু পরিশ্রমী ও নিষ্ঠাবান, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। তারা সফল হওয়ার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন, আর নিজের একশ ভাগ উজার করে দিয়েছেন, তাই তারা সফল।   অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু আজ আমি তোমাদের সামনে এমন একজনকে নিয়ে আসতে চলেছি, যে একই সাথে মেধাবী,  পরিশ্রমী, দৃঢ় প্রতিজ্ঞ,  যার নিষ্ঠায় কোনও ত্রুটি নেই, যে তার ব্যক্তিগত জীবনের সব বাধা দূরে সরিয়ে আজ সফল, শুধু সফল নয়, তার All India Ranking 4. 

আমার দেখার আগ্রহ বেড়ে গেল। 
সঞ্চালক বলে গেলেন - 
- যিনি তার সাত মাসের প্রেগন্যান্সি নিয়ে মেন পরীক্ষা দিয়েছেন, আর একমাসের সন্তানকে নিয়ে Interview দিয়েছেন। 

আমি অবাক হয়ে গেলাম। এমন স্টোরি তো শুনিনি। আমার আগ্রহ বেড়ে গেল। সেই মেয়েকে দেখার জন্য একবার ভিডিওটি skip করতে ইচ্ছে হল, কিন্তু কথাগুলো শোনার জন্য অপেক্ষা করলাম। 

তিনি বলে চললেন - 
- তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন,  ইচ্ছেশক্তির থেকে বড় কোনও শক্তি নেই। আমারা একাডেমির সকল সদস্য তাকে কুর্নিশ জানাই। প্লিজ, মঞ্চে আসবেন  মিস অনিন্দিতা রায়।  

আমার একটু খটকা লাগল, বলছে সন্তান নিয়ে পরীক্ষা দিল, আবার বলছে মিস।  যাইহোক, আমি শুনতে থাকলাম। 

আগেই বলেছি, আমি তিতলির কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। নামটি শোনার পরেই বড় বড় চোখে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকি। এভাবে ওকে খুঁজে পাব, স্বপ্নেও ভাবিনি। আমার গল্পের নায়িকা যে এভাবে সাফল্য হাসিল করবে, এ আমার কল্পনার অতীত। ওর জয় যেন আমারই জয়। মুহূর্তে ছ বছর আগের সেই ট্রেনে পড়তে দেখা মেয়েটির মুখ, তার চালচলন,  তার লুকিয়ে রাখা প্রেম, কাঠিন্য সব ভেসে উঠলো।  তাহলে কিছুই বৃথা যায়নি, কিছুই বৃথা যায় না আসলে? মনে হচ্ছিল যেন আমারই পরিবারের কেউ যুদ্ধে জয়ী হল। 

আবার সন্দেহ হল, এ কি আমার গল্পের তিতলি না অন্য কেউ!  
মঞ্চে যে এল, তার পরনে হাল্কা নীল শাড়ি, পিঠে ছোট খোলা চুল, চোখে রিমলেস চশমা,  বাঁ হাতে ব্রাউন বেল্টের ঘড়ি, ডান হাতে একটি বালা, গলায় সরু চেন, কানে ছোট দুল। মুখে প্রশান্তি।  ধীর অথচ দৃঢ় পায়ে মঞ্চের মাঝে দাঁড়ালো। সঞ্চালক মাইক এগিয়ে দিলেন। 

হ্যাঁ, এ সেই আমার গল্পের তিতলি।  আমাদের গ্রামের তিতলি। 

ও যা বক্তব্য রাখল, সবটাই ইংরেজিতে,বাংলা করলে এমন দাঁড়ায় - 

- আমার একাডেমির সকল স্যার, ম্যাডামকে আমার প্রনাম, ভালবাসা জানাই, তারা পাশে না থাকলে এই সাফল্য কখনোই পাওয়া সম্ভব হত না। আমি জানি,  আমার জার্নি একটু আলাদা ছিল। তার জন্য আমি আমার পরিবারের সদস্য মানে আমার মা, বাবা, ছোট বোন ও ভাইকে আলাদা করে ধন্যবাদ দেব, ওরা পাশে না দাঁড়ালে আজ তোমাদের সামনে কথা বলার সুযোগ হত না। তবে আমি আমার লড়াই নিয়ে কিছুই বলতে চাই না। আসলে আমাদের সবাইকেই লড়তে হয়,  শুধু লড়াইয়ের ধরন ভিন্ন ভিন্ন। শুধু এটুকুই বলব, কখনো মনে করবে না, আমিই সবথেকে বড় প্রব্লেমের মধ্যে আছি, সেটা তোমাকে শুধুই পিছন দিকে নিয়ে যাবে। যে অবস্থাতেই থাকো না কেন, লক্ষ্যে পৌঁছাতে যা যা করা দরকার, সেই কাজটি নিরবচ্ছিন্ন ভাবে করে যেতে হবে। বাকী সব কিছুকে পাশ কাটাতে হবে। সব মানে,  স....ব। সাফল্য তবেই আসবে। 

আমার মনে আবার প্রশ্ন, স্বামীর কথা তো কিছু বলছে না। তবে কী..... ,  দেখি পরে কী বলে!  

আবার বলছে -
ব্যক্তিগত জীবনে সমস্যা আসতেই পারে, সেগুলো পাশ কাটিয়ে চলা অভ্যাস করে ফেলতে হবে। তুমি তোমার শরীরে তোমার সমস্যা বহন করে বেড়াতে পারবে না। কেউ তার মূল্য দেবে না। সিমপ্যাথি পেয়ে বড় কিছু করা যায় না, সেটা আশাও করবে না। বিশ্বাস রাখো নিজের উপর, পরিশ্রমের উপর, সততার উপর। নিরলস ভাবে, সঠিক পথে পরিশ্রম করার মানসিকতা গড়ে তোল। আমাদের স্যারেরা রয়েছেন তোমাদের জন্য। আমি বড় কিছু করে ফেলিনি, অবিশ্বাস্য কিছু করে ফেলিনি, আমি জিনিয়াস নই, আমি আলাদা কোনও প্রানী নই। আজ আমি যেটা পেরেছি, কাল তোমরাও সেটা পারবে। আগামী দিনে তোমরাও অন্যদের মোটিভেট করবে, স্টেজে বক্তব্য রাখবে। আমি তোমাদের থেকে একটি কথা নিয়ে যেতে চাই, আমাকে কথা দাও, তোমরা সবাই UPSC Clear করবে। 

সমবেত সবাই চিৎকার করব জানায় - 
ইয়েস,  ম্যাম। উই প্রমিস ইউ। 
-  Thank you.  

এই বলে স্টেজ ছেড়ে দেয়। অনুষ্ঠান চলতে থাকে। আমার আর দেখার ইচ্ছে হয় না। আমি আবার সার্চ করতে শুরু করি, অনিন্দিতা রায়ের অন্যান্য interview পাওয়া যায় কিনা।।যাতে জানতে পারি, তার বর্তমান সামাজিক অবস্থান, পারিবারিক অবস্থান, এমমকি তার পোস্টিং কোথায় হল। আমাকে জানতেই হবে। গল্পের প্রয়োজনেই আমাকে জানতে হবে। 

আপাতত জানতে পারলাম তিতলি UPSC Clear করেছে, কোন পোস্টে আছে আর কোথায় পোস্টিং, আর ওর রিসেপশনিস্ট থেকে IAS হওয়ার জার্নি জানতে পারলে এই গল্পের সপ্তম দৃশ্যটি লিখে ফেলব। এবার অনির্বান কেও আর একবার খুঁজে বের করতে হবে। 

শুভরাত্রি।

Wednesday, March 11, 2020

কথোপকথন – ২

কথোপকথন – ২ 
....................................

আজ সকালে এক আত্মীয়াকে ট্রেনে তুলে দেওয়ার বিষয় ছিল, সে যাবে জিয়াগাঞ্জ আর আমি যাব ব্যারাকপুর। ঠিক করেছিলাম অফিস যাওয়ার পথে একই ট্রেনে যাব, সে কালীনারায়নপুরে নেমে যাবে আর আমি সোজা চলে যাব ব্যারাকপুর, কিন্তু বাধ সাধল আমার তিন বছরের মেয়ে। সে বলে বসল, 
- বাবা, আমিও তোমার সাথে যাব। 
কান্নাকাটির ঝামেলা না করার জন্য আমি বললাম ঠিক আছে, তাই হবে, তুমিও যাবে। যথারীতি আমরা তিনজন বাইকে যাত্রা করলাম। বুঝে গেলাম আজ আর সঠিক সময়ে অফিস যাওয়া হচ্ছে না, চারদিন পরে অফিস খুলল, তাও আবার লেট। যাইহোক, সেই আত্মীয়াকে ট্রেনে তুলে দিয়ে দিলাম।  

গল্পটি এবার শুরু। প্লাটফর্ম দিয়ে হাঁটছিলাম, আমি আর মেয়ে, একটি ট্রেনের টিকিট পড়ে ছিল। লোকের পায়ে পায়ে নোংরা হয়েছে। মেয়ে বলল, 
- বাবা, এটা কী পড়ে আছে? 
- টিকিট পড়ে আছে মা। 
- কারা ফেলেছে বাবা?
- লোকেরা । 
- কোন লোকেরা বাবা?
- ঐ যারা ট্রেনে করে এখান থেকে কোথাও যায়, বা অন্য কোথাও থেকে ট্রেনে করে এখানে এসেছে, তারা। 

এবার একটু অন্যরকম প্রশ্ন, 
- লোকেরা টিকিট ভালোবাসে না, বাবা ? 
খুব স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর দিলাম, 
- হ্যাঁ, মা, বাসে তো, বাসবে না কেন? 
- তাহলে ফেলে দিয়েছে কেন? 
- আর দরকার নেই বলে। 
এবার আমার অবাক হওয়ার পালা। 
- দরকার না থাকলে কি ভালোবাসতে হয় না, বাবা ? 

একটু চুপ থাকলাম, বললাম, 
- হ্যাঁ, মা, দরকার না থাকলেও ভালবাসা যায়, ভালবাসতে হয়। 
ছোট্ট মানুষের সহজ প্রশ্ন, 
- তাহলে লোকেরা ওগুলো ফেলে দিল কেন? 
- ওগুলোর আর প্রয়োজন নেই মা, ওদের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। 
- প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে ভালোবাসতে হয় না? 
- হ্যাঁ, মা, প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলেও ভালোবাসতে হয়।  যত্ন করতে হয়। 
ছোট্ট মানুষটি কী বুঝলো, কে জানে, সে বলল, 

- ও, তাই? 
- হ্যাঁ, তাই, মা আমার। 
আমরা প্লাটফর্ম পার করে গ্যরেজে চলে এসেছি। বাইকে মেয়েকে বসিয়ে বললাম, তুমি কিছু খাবে মা, 
- না, বাবা, বাড়ি চল, আমি তোমার সাথে স্নান করব। 

বাইক ছুটছে, মেয়ে আয়নায় মুখ দেখছে, আমার মাথায় প্রশ্ন ঘুরছে, আমরা কি সত্যিই প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলেও  ভালোবাসতে পারি? দরকার মিটে গেলেও ভালোবাসতে পারি? নিজেকেই প্রশ্ন করলাম। না, আমিও পারি না, পারি নি,আমার তরফ থেকেও অনেক অবহেলা আছে, যত্নের অভাব আছে, কিছুটা নিজের জগত তৈরি করে সেটাতেই নিজেকে আবদ্ধ রেখে ভাল থাকার চেষ্টা আছে। আমার কাছে এগুলো ভুল বলে মনে হলেও এই অভ্যাস থেকে বেরোতে পারি না। ভয় হয়, না জানি সম্পর্ককে যত্ন নিতে গিয়ে বিপরীত দিকে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি ভেবে না বসে, আবার বুঝি কোনও দরকারে এসেছে। তার চেয়ে এই বেশ ভাল আছি। ভালোবাসাটি মনেই থাকুক সসম্মানে। 

আচ্ছা, আমাদের জীবনে কী সবটা কি দরকার আর প্রয়োজন ভিত্তিক? না , নিশ্চয়ই। ছোটবেলায় পিসি বাড়ি, মাসি বাড়ি, কাকা বাড়ি যেতাম,সকলেই গেছে,  নেহাত ঘুরতে, আনন্দ করতে, কোনও দরকার ছিল না, ভালোবাসা আর আদরের বিনিময়টাই সব ছিল। আর আজ বড় হয়ে সেই একই জায়গায় দরকার ছাড়া বা কোনও আমন্ত্রন ছাড়া যাওয়া হয় না। অনেক সময় আমন্ত্রনেও যাওয়া হয় না। বিপরীত দিকের অবস্থাও একই। এটাকে অবহেলা ছাড়া কী বলব? আবার এটাও ঠিক, যে সময়ের সাথে সাথে মুখের বদল হয়, নতুন কেউ অনেকখানি জায়গা পায়, প্রায়োরিটি বদলে যায়। আর কিছু পুরোনো সম্পর্ক অজ্ঞাতবাসে চলে যায়। 

 যাদের সাথে মেলামেশা, তারাও যত্ন করতে পারেনি, পারে না, সবই ক্ষণস্থায়ী বলে মনে হয়। প্রতিটি সম্পর্ককে যতটা যত্ন করা দরকার, পরিচর্যা করা দরকার, আমরা অধিকাংশই সেটা করতে পারি না, হয়ত করিও না । আর পরিচর্যার অভাবে প্রতিটি সম্পর্কই নিয়মরক্ষার উষ্ণতাবিহীন সম্পর্কে পরিনত হয়। ঠিক যেন, প্রয়োজনের তাগিদেই কিছু মানুষের একত্রিত হওয়া, সম্পর্কে আবদ্ধ হওয়া, কিছুকাল একসাথে অতিবাহিত করা, আবার যার যার পথ ধরে একাকীত্বের পথে পা বাড়ানো। বড়ই গোলমেলে গো, বড়ই গোলমেলে। 

অনেক বেশি বকে ফেললাম। আর, কাজ না থাকলে যা হয় আর কী! মাথার মধ্যে কত কিছু যে কিলবিল করে বেড়ায়। এতটা পড়ার জন্য ধন্যবাদ দিতেই হবে, কেননা আমাদের মন এতটা সময় একজায়গায় আজকাল আর দাঁড়ায় না। ধন্যবাদ আর শুভ্রাত্রি।

Sunday, March 8, 2020

উদযাপন বিতর্ক

উদযাপন বিতর্ক
............................
হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন, ঠিক এই বিষয়টি নিয়েই কিছু বলতে যাচ্ছি। গত কয়েকদিন সোশ্যাল মিডিয়াতে  যা নিয়ে ঝড় বয়ে যাচ্ছে, সেই বিকৃত চর্চা, বিকৃত প্রকাশ, বিকৃত আনন্দ আর বিকৃত উদযাপন। আবার এই বিকৃত শব্দটি নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়, তুমি কে হে বিকৃত বলার? ঠিক কতটুকু নিয়ম ভাঙলে তাকে বিকৃত বলা যায়? এই বিকৃতির সীমারেখাই বা কে নির্ধারণ করবে? স্কুল কলজে পড়া হাজার হাজার শিক্ষিত (?) ছেলেমেয়ে যখন সমবেত ভাবে এই বিকৃতিকেই আনন্দ করে উদযাপন করছে, তখন তাদের মানসিকতা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, রুচিবোধ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে বৈকি। আবার সাথে সাথে এর পাল্টা প্রশ্নও ওঠে, এগুলো ঠিক করার আপনি কে? আমার আনন্দের প্রকাশ কিভাবে হবে, সেটি ঠিক করার আপনি কে? আমার শরীরে আমি কোন শব্দ লিখব, সেটি কি আপনি ঠিক করবেন? সত্যিই তো, আমরা কারা। তাহলে কে প্রশ্ন করবে?  আর যখন বৃহত্তর অংশ সংগঠিত ভাবে ভুল বিষয় উপস্থাপন করে, নিজেদের অসহায়তা সেখানে প্রকট হয়ে পড়ে। কেউ আবার ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্ন তুললে গোলকধাঁধায়  পড়তে হয়। সমস্ত বিষয় তর্কসাপেক্ষ।
কিন্তু বারে বারে কবিগুরুর গান বিকৃত হচ্ছে কেন? যিনি প্রথমবার গানটির মাঝে কিছু গালাগালি যুক্ত করে গেয়েছেন, তিনি অবশ্যই দোষী। তার অনেক ফলোয়ার, তাকে অনেকে সমর্থন করেন । তাকে অনেকে গালাগালি করেন, কেউ বা বলেন তাকে বোঝা নিম্ন বা মধ্যমেধার কাজ নয়। তিনি নাকি সমাজকে নতুন করে প্রতিবাদ করার পথ দেখাচ্ছেন। নতুন ভাষা , নতুন শব্দ, নতুন ভঙ্গী সৃষ্টি করছেন। সত্যিই কি তাই? হবে হয়ত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের বসন্ত উৎসব ঘিরে যে ছবিগুলো সামনে এসেছে, বেশীরভাগ মানুষই তাকে সহজভাবে গ্রহন করতে পারেননি।  না পারারই কথা। আমাদের দীর্ঘদিনের অভ্যাসে যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বসবাস করেন, তার গানের কথার বিকৃতি সহ্য করা সত্যিই কঠিন। আর পাঁচজন কবি-লেখকের সাথে আমরা তাকে একাসনে রাখি না, তিনি স্বকীয়, স্বতন্ত্র। তাই ২৫ শে বৈশাখ, ২২ শে শ্রাবণ আলাদা অনুভূতিতে উদযাপিত হয়। এর ঠিক বিপরীতেও একদল আমরা আছি, যারা মনে করছি, স্বয়ং ভগবানের যখন বিকৃতি হয়, তাহলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাদ যাবেন কেন? ওনার লেখা কি কারও বাপের সম্পত্তি? আমাদের বাক-স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার তুমি কে হে? যেমন ভাবে খুশি গাইব, যে শব্দ আমার পছন্দ হবে সেই শব্দ বসিয়ে গাইব। বেশ, তাই হোক তবে। কিন্তু যেমন খুশি সুর আর যেমন খুশি শব্দ নিয়ে কিছু মৌলিক সৃষ্টির চেষ্টা হলে বেশী ভাল হয় না কি? অন্তত মস্তিষ্কের ভাল ব্যায়াম আর পুষ্টির যোগান হত। কিছু আমাদের এমনও মনে হয়েছে, যারা আজ গান বিকৃতি করেছে, তারাই হয়ত বড় হয়ে রবীন্দ্র-গবেষক হবে, গলা ভারী করে গান-বক্তৃতা করে সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রথম সারিতে থাকবে। খুব স্বাভাবিক। আজ আমরা যারা গেল গেল রব তুলছি, তারাই স্কুল কলেজ জীবনে কত না মজার গান বানিয়েছি, তাতে খারাপ শব্দও ছিল। ক্লাসে বেঞ্চ বাজিয়ে গেয়েওছি। তখন সেটার প্রকাশ ছিল না, প্রচার ছিল না, বন্ধুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। আর নিজেদের কাছেও সেগুলো কখনও অশ্লীল বলে মনে হত না, বরং সেগুলো ছিল এক ধরনের গোপন আনন্দ। মজার বিষয়। আর আজকে সবাই সবার এই মজার বিষয়টিকেই নেটের জন্য জেনে যাচ্ছি আর প্রতিক্রিয়ার বহর বাড়ছে। আর যারা এগুলো করছে, তারাও যে খুব সিরিয়াসলি এগুলো নিয়ে ভেবেছে, তা মনে হয় নয়। তবে আমরা দায়িত্বশীলতা আশা করতেই পারি। তাই নয় কি?
সবচেয়ে কষ্ট পেয়েছে বসন্ত উৎসবের উদ্যোক্তা রা। তাদের উৎসবের আয়োজনের কমতি ছিল না, বিভিন্ন ডিপার্টমেন্ট খুব ভাল পারফর্ম করেছে, অনেক মানুষ প্রশংসা করেছে, কিন্তু সেগুলো কিছুই সেভাবে সাধারন লোকের সামনে আসেনি। একটি ঘটনাকে সামনে রেখে সবকিছুই চাপা পড়ে গেছে। সত্যিই দুঃখজনক।  
এর সাথে ঝড় বয়ে গেল, মালদার চার স্কুল ছাত্রীর আরও হাই ভোল্টেজ ( যদি গালাগালির শ্রেনীবিন্যাস করা হয় ) বিকৃত শব্দের মিশ্রনে গান গাওয়াকে কেন্দ্র করে। এই ঘটনাতেও আমাদের বেশীরভাগ মানুষই নিন্দায় মুখরিত হয়েছে। ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক। এই ভাবে বা এর থেকেও খারাপ ভাবে যে গান গাওয়া হয় না, তা কিন্তু নয়, সমস্যা প্রকাশ করাতে, মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়াতে সৃষ্টি হয়েছে। না জানি এমন কত গান, কত ভাবে প্রতিদিন রেকর্ড হচ্ছে। এটাও হয়ত নিছক মজা করার জন্যই ছিল। এক্ষেত্রেও আমরা একটু দায়িত্বশীলতা, পরিনত মনস্কতা আশা করতে পারি। তারা নেহাত শিশু নয়। আবার আমাদের মধ্যেই কিছু মানুষ বলেছি, এখন মজা করবে না তো, কখন করবে? ওরা যে শব্দে গান গেয়েছে, ওদের মুখে খুব ভাল মানাচ্ছে, লাইফটাকে এনজয় করছে, যারা খুব ভাল হয়, তাদের আর কিছু করা বা হয়ে ওঠা হয় না, এমন আরও কত কথা। ওদেরকে আমরা অনেকে সমর্থনও করেছি। তারা ভুল শুধরে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। কেউ বলেছি, ওরা ভুল করেছে কিন্তু অন্যায় করেনি। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমরা যারা বড়, যারা পিতা মাতা হয়েছি, তারাও আজ বহু ধারায় বিভক্ত। এই ঘটনাগুলো কি একটু হলেও ভাবায় না?
এই সবের মাঝে কিছু আমরা আছি, যারা নির্বিকার শ্রেণীর, সকাল থেকে সন্ধ্যা পয়সার জন্য কাজ করি, সংসার চালাই, ছেলে মেয়েকে পড়াশোনা শেখাই, ঘুমিয়ে উঠে আবার কাজে যাই। কে রবীন্দ্রনাথ, কার গান কে গাইল, কে কোন শব্দ দিয়ে গাইল, কিচ্ছু লেনা দেনা নেই। কী ফেসবুক, কী হোয়াটস অ্যাপ, কার ভুলে সমাজ সংস্কৃতি গোল্লায় যাচ্ছে, আদৌ কোথাও যাচ্ছে না থেমে আছে, বসন্ত উৎসব আবার কারে কয়, চাঁদ কোথায় উঠেছিল, ফেসবুক স্ট্যাটাস কারে কয়, বড় বড় বাতেলা দেওয়া কাকে বলে, কোন বাড়ির মেয়ে কোথায় কিভাবে নাচলো, ভাড়মে যা। প্রতিবাদ?  সেটা আবার কী বস? ভোর চারটেয় উঠে কাজে না গেলে ভাত জুটবে না। ওসব ফেসবুকের প্রতিবাদ নিয়ে তোরাই থাক বস।
(কিছু কথা খারাপ ভাবে লিখে বাকস্বাধীনতা চর্চা করা হল)
জীবনের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করতে যে মানুষগুলো হিমসিম খায়, তাদের একবার জিজ্ঞেস করে দেখো তো কেউ, চাঁদ না উঠলেও তাদের কিছু যায় আসে কিনা ! জিজ্ঞেস কোরো তো, বসন্ত উৎসব মানে কী? ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকবে। জাস্ট ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকবে। তাই লড়াইটা জীবিকার জন্য হোক, বেঁচে থাকার শর্ত পূরনের জন্য হোক, আর প্রতিবাদটা অন্যায় আর অসাম্যের বিরূদ্ধে হোক।



Sunday, February 16, 2020

সবটা গল্প নয় (বাকি অংশ) পঞ্চম দৃশ্য

সবটা গল্প নয় ( বাকি অংশ) 

.............................

কথা ছিল যদি কখনও মেয়েটির সন্ধান পাই, সেদিন পঞ্চম দৃশ্যটি লিখে ফেলব। আজ সেটি লিখে ফেলার সময় এসেছে। যে মেয়েটিকে শুধুমাত্র বিবাহিতা অবস্থায় ট্রেনে দেখেছিলাম, যার নাম, ঠিকানা কিছুই জানতাম না, তার খোঁজ পাওয়া মোটেই সহজ ছিল না। তার সন্ধান কিভাবে পেলাম, শুধু সেটি নিয়েই আরেকটি গল্প লেখা যায়। 
ছুটির দিনে বিছানায় আধশোয়া হয়ে ফেসবুক দেখছিলাম, অনেকগুলো ফ্রেন্ড সাজেশন ঘুরছিল। স্ক্রোল করে দেখতে দেখতে একটি মেয়ের ছবিতে চোখ আটকে যায়, না, সে আমার গল্পের মেয়ে নয়, অন্য মেয়ে, তার সাথে আমার দশটি কমন ফ্রেন্ড আছে। আমি তার প্রোফাইল খুলি, স্বাভাবিক আগ্রহবশেই খুলি শুধুমাত্র দেখার জন্যই। কিছু খোঁজার মন নিয়ে খুলিনি। সেই মেয়েটিরও বাড়ি হবিবপুর। মেয়েটির ফটো সেকশন খুলে দেখতে দেখতে অনেক পিছনের দিনে চলে যাই, প্রায় পাঁচ ছ বছর পিছনে চলে যাই। সেখানে রানাঘাট কলেজের সরস্বতী পূজার সময় মেয়েটির কিছু গ্রুপ ছবি দেখতে পাই, মেয়েদের গ্রুপ, প্রায় দশ –বারো জনের গ্রুপ। সেই ছবি জুম করে দেখতে থাকি। 

অবাক কান্ড। সেই গ্রুপে আমার গল্পের মেয়েটিকে দেখা যায় হলুদ শাড়িতে, খুব সাধাসিধে ভাবে, সবার থেকে আলাদা মুডে। আর সবাই যেমন ছবি তোলার সময় মুখ বাঁকিয়ে, ঠোঁট বাঁকিয়ে, কেউ বা জিভ বের করে, কেউ বা চোখ বাঁকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আমার গল্পের মেয়েটি সেখানে নিছক বেমানান হয়ে ভদ্র ভাবে হাল্কা হাসিতে দাঁড়িয়ে আছে। আজকালকার এই ধরনের চোখ মুখ বাঁকানো মেয়েদের দুষ্টু ছেলেরা পোলিও খাওয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়। আমারও যে মনে হয়না, সেটা বলছি না, তবে চুপ থাকাই শ্রেয় মনে করেছি। না হলে হয়ত, অনধিকার চর্চা বা মানবাধিকার লঙ্ঘন করার দায় নিতে হবে। যাক সে কথা। 
আমি সেই ছবির স্ক্রীনশট নিয়ে রাখি আর আমার মিসেস কে দেখাই। কেননা, সেও হবিবপুরের মেয়ে, সেও ২০১৩ তে এম.এ. পাশ করেছে, কল্যানীতে পড়েছে, এলাকার মেয়ে হিসেবে হয়ত চিনতে পারবে, এই আশায় তাকে ছবিটি দেখাই। মিসেস তিন চারজন মেয়েকে চিনতে পারল। আমার আগ্রহ, আমার গল্পের মেয়েটিকে নিয়ে, না, সে তাকে চিনতে পারল না, বলল, মাঝে মাঝে হয়ত বা দেখেছে, কিন্তু ঠিক গল্পের মেয়েটির পাশের মেয়েটিকে চিনতে পারল। আমি বললাম, 
- পাশের মেয়েটিকে চিনতে পারছ?
- হ্যাঁ, এই মেয়েটিকে চিনি।
- হবিবপুরে থাকে?
- হ্যাঁ গো, তুমি যে কাকুর থেকে ওষুধ আনো, ওই যে বাজারে দোকান, সেই কাকুর ছোট মেয়ে। 
- তোমার সাথে পড়ত?
- না, ও আমার থেকে ছোট, ওর দিদি আমার সাথে পড়ত।
- আর এই মেটিকে চিনছ না? এই যে হলুদ শাড়িতে? 
- দেখেছি মনে হচ্ছে, কিন্তু আমাদের এই দিকটায় থাকে না মনে হচ্ছে। তুমি ওই কাকুকে একবার জিজ্ঞেস করতে পারো। 

দিন দুয়েক পরে আমি ওষুধ নিতে কাকুর দোকানে গেলাম। আমার সাথে ভাল পরিচয়, সবসময় তার কাছে যাই, কথায় কথায় বলেই ফেলি, 
- কাকু, তোমার মেয়েরা চাকরি-বাকরি কিছু পেল? 
একটু অবাক হল। আমার সাথে শুধু ওষুধ নিয়েই কথা হয়, আজ এই আচমকা প্রশ্নে তাকিয়ে রইল, কিছুক্ষন। 
- তোমার বড় মেয়ে আর আমার মিসেস স্বপ্না তো একসাথেই পড়ত শান্তিপুর কলেজে, তাই না? 
- হ্যাঁ, হ্যাঁ, ওর তো বিয়ে হয়ে গেছে। আর চাকরির চেষ্টা করেনি। 
- আর ছোট জন?
- ও ইংলিশ এ এম.এ. করেছে, বি.এড. করছে। টিচার হওয়ার ইচ্ছে। 
- তোমার ছোট মেয়েকে আমি দেখেছি।
- হ্যাঁ, ও তো মাঝে মাঝে দোকানে বসে। 
- আমি দোকানে দেখিনি, তবে ফেসবুকে দেখেছি।
- ও আচ্ছা। 
বলেই আমি পকেট থেকে মোবাইলটি বের করে ছবিটি দেখাই। 
- এই দেখো , কাকু।
- এ তো অনেক আগের, কলেজের মনে হচ্ছে। 
- হ্যাঁ, কাকু।
এবার আমার আসল উদ্দেশ্যে চলে এলাম। বলে ফেললাম, 
- আচ্ছা কাকু, এই হলুদ শাড়ি পরা মেয়েটিকে চেনো? 
- দেখি।। 
কাকু ভাল করে দেখলো। 
- হ্যাঁ, চিনি তো, আমাদের পাড়াতেই থাকে। আমার মেয়ের সাথেই পড়ত। ওর তো বিয়ে হয়ে গেছে। 
- নাম কী কাকু, মেয়েটার? 
- আমরা তো ওকে তিতলি বলে ডাকি, খুব ভাল মেয়ে,ও, আমাদের বাড়িও আসত, তবে ওর একটা ভাল নামও আছে। ভুলে গেছি। 
- কোথায় বিয়ে হয়েছে কাকু?
- ওর বেলঘড়িয়ায় বিয়ে হয়েছে। 
ইতিমধ্যে কিছু কাস্টমার দোকানে এসেছে, আমাদের কথাবার্তা সাময়িক বন্ধ থাকল। আবার ফাঁকা পেলাম, 
- কাকু, ওর বর কী করে? 
- ওই মেডিক্যাল লাইনেই আছে। 
- ডাক্তার নাকি?
- না, ঠিক ডাক্তার না, আবার কম কিছুও না।
- মানে?
- টেকনিশিয়ান গোছের, তবে খুব উঁচু পোষ্টে কাজ করে। 
- তুমি কি জানো, কোথায় চাকরি করে? 
- যখন বিয়ে হয়, তখন খড়দায় সুরক্ষাতে চাকরি করত। ওরা তো  আবার ছেড়ে অন্য জায়গায় চলেও যায়, এখন কোথায় আছে জানি না। 
- বিয়ের পরে এখানে আসেনি?
- হ্যাঁ, দু একবার এসেছেও। পূজাতে এসেছিল তো। 
- ও আচ্ছা। 
- তা তুমি এই মেয়েটার কথা শুনছ কেন? চেনো নাকি? 
- না কাকু, চিনি না, তোমার মেয়ের সাথে দেখলাম, তাই জিজ্ঞেস করলাম। স্বপ্না ওর কথা বলছিল, বলল, তুমি হয়ত চিনবে, তাই আর কি। 
- ও। 
- আসি তাহলে কাকু। 

এই বলে চলে এলাম। মোটামুটি একটা ধারনা পেলাম। ডাকনাম পেলাম, শ্বশুরবাড়ির অবস্থান পেলাম, স্বামীর স্ট্যাটাস পেলাম। তবে এইটুকুই যথেষ্ট ছিল না। আমার জানার আগ্রহ ছিল, তিতলি ব্যক্তিগত জীবনে কোথায় গিয়ে পৌছল।একবার, তিতলির মুখোমুখি দাঁড়ানোর ইচ্ছে আছে। দেখা যাক, আমিও কোথায় গিয়ে থামি। 

ঘটনাক্রমে একদিন তিতলির মুখোমুখি দাঁড়ানোর সুযোগ পেয়ে যাই। এবার আসব সেই ঘটনায়। 

দৃশ্য – ৫
.......................................

আমার বাবার বয়স হয়েছে, প্রায় ৭২ হবে, কোমরে সমস্যা, খুব ব্যথা, সেখান থেকে বাঁ পায়ে সমস্যা, দাঁড়াতে পারে না, হাঁটু আপনা আপনি ভেঙে বসে পরে। প্রথমে অর্থপেডিক দেখানো হল, নৈহাটিতে, তারপরে নিউরোসার্জন দেখানো হল, সেটাও নৈহাটিতেই। অনেক রকম টেস্ট, দীর্ঘদিনের চিকিৎসা ও ফিজিওথেরাপির পর বাবা মোটামুটি সুস্থ। সে সব বিস্তারিত কথায় যাচ্ছি না। কিন্তু এটুকুর সাথে আমার গল্পের যোগ আছে, তাই লিখতেই হল। 
অর্থোপেডিক ডাক্তার কোমরের এম.আর.আই. করতে দিয়েছিল আর সাথে খড়দাতে সুরক্ষায় যাওয়ার সুপারিশ করেছিল। যে সময়ের কথা বলছি, তখন নৈহাটিতে কোথাও এম.আর.আই. করানো হত না, কাছাকাছি ছিল কল্যানীতে, খরছ ছিল ছয় হাজার টাকা, কিন্তু ডাক্তারের সুপারিশে খড়দা থেকে করালে খরচ হবে আড়াই হাজার টাকা, তাই খড়দা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। তখন বাবা হাঁটতে পারে না, আমি আর আমার মিসেস বাবাকে নিয়ে গাড়ি ভাড়া  করে সোজা খড়দা সুরক্ষা তে, যেখানে আমার জন্য অবাক হওয়ার পালা অপেক্ষা করছিল। সাথে কিছুটা বেদনা। 

সুরক্ষায় ঢুকেই বাঁ হাতে রিসেপশন, সেখানে তিনজন সুসজ্জিত, স্মার্ট, দক্ষ মহিলা কাজ সামলাচ্ছেন। আর তাদের মাঝে একটি মহিলা আমার গল্পের তিতলি।ও ঠিক মাঝে রয়েছে, আর ঘটনাক্রমে ওর কাছেই লাইন কম ছিল, আমি বাবা আর মিসেসকে বসিয়ে লাইনে দাঁড়াই, আমার লাইন আসে, আমি তিতলির মুখোমুখি, যার সাথে কখনও কথা বলনি, আজ তার সাথে প্রথম কথা। তার সেই আগের গাম্ভীর্য আবার ফিরে এসেছে, এবার যেন অনেক বেশি দায়িত্ববান, অনেক বেশি নিষ্ঠা। আমি লাইনে দাঁড়িয়ে তার গতিবিধি, নড়াচড়া, কথাবলা, তাকানো সবই লক্ষ্য করছিলাম কিন্তু সে নিজেকে এতটাই ঢেকে রেখেছিল তার গাম্ভীর্য দিয়ে, আমি ঠিক পড়তে পারছিলাম না। তার দু চোখ খুব মন দিয়ে দেখছিলাম, খোঁজার চেষ্টা করছিলাম, সে কি এটাকেই তার শেষ গন্তব্য বলে মেনে নিয়েছে, নাকি আজও সেই কিছু করার জেদ কিছুটা অবশিষ্ট আছে। আমার মন বলছিল, সে এটাকেই তার গন্তব্য বলে মেনে নেয়নি, সেই মেয়ে শেষে একজন সাধারন রিসেপশনিস্ট হয়ে বাকি জীবন কাটাতে পারে না। আমার মন বলছিল, সে ভিতরে ভিতরে আজও নিজের সাথে লড়ছে। 

এইসব ভাবতে ভাবতেই আমি তিতলির গলার আওয়াজে সম্বিৎ ফিরে পেলাম।  
- আপনার বুকিং নাম্বার টি কত স্যার?
- ফরটি সিক্স ম্যাম।
- পেসেন্টের নাম?
- মহাদেব হালদার।
- বিলিং অ্যাড্রেস টি বলবেন প্লিজ। 

আমি সব কিছু বলে, ক্যাশ জমা করে দিলাম। সে বলল, 

- এম.আর.আই. ছিল, ফরটি ফোর ঢুকেছে, আপনারা প্লিস বসুন, আমরা অ্যানাউন্স করব। 
- থ্যাঙ্ক ইউ ম্যাম। 
এই বলে আমি বাবার পাশে গিয়ে বসি। আর অপেক্ষা করতে থাকি। বুঝে যাই অন্তত ঘন্টা খানেক অপেক্ষা করতে হবে। কেননা একটা এম.আর.আই. করতে প্রায় আধ ঘন্টা সময় লাগেই। নিজের হাঁটুর এম.আর.আই. করার সময় প্রায় চল্লিশ মিনিট ঠান্ডা ঘরে  কম্বল চাপা দিয়ে শুয়ে থাকতে হয়েছিল। সেখান থেকেই সময়ের আন্দাজটি পেয়েছি। 

এখানে তিতলির দেখা পেয়ে আমি একসাথে অবাক, খুশি, আবার ব্যথিত। ওর বর্তমান পরিস্থিতি আমার ঠিক সুবিধার মনে হচ্ছিল না। ওর সাথে  কথা বলার জন্য খুব আগ্রহী ছিলাম। 

ওকে একবার সিঁড়ি দিয়ে ওপড় তলায় যেতে দেখলাম, একটু ভারী হয়েছে, বোঝা যাচ্ছে। আর একবার এম.আর.আই. রুমে গিয়ে কিছুক্ষন থেকে এল। ওর ফেরার পথে ওর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম, বলে ফেললাম, 
- এক্সকিউজ মি, ম্যাম।
- হ্যাঁ বলুন।
- আপনার সাথে দুটো কথা বলা যাবে? 
- হ্যাঁ, বলুন।
- আপনি কি ম্যাডাম, হবিবপুর থাকতেন? 
- হ্যাঁ, কেন বলুন তো?
- না। আসলে আমিও হবিবপুর থাকি তো, তাই আর কি।
- কিন্তু আপনার বিলিং অ্যাড্রেস যে নৈহাটি দেখলাম!
- হ্যাঁ, ম্যাম, আসলে আমার নিজের বাড়ি নৈহাটিতেই, আর আমার মিসেসের বাড়ি হবিবপুরে। 
- ও আচ্ছা। 
এই বলে সে চলে যেতে উদ্যত হল। আমি জানি এই সুযোগ হয়ত আর পাবো না, তাই একনাগাড়ে বলে গেলাম,
- আমি ম্যাম অনেক আগে আপনাকে রানাঘাট স্টেশনে আর ট্রেনে বই পড়তে দেখতাম, সেখান থেকেই আপনাকে চিনি। 
মেয়েটি চলে যেতে গিয়েও থেমে গেল। এক মুহূর্তের জন্য চোখ  নামিয়ে নিল। মুখে হাল্কা মেকআপ করা থাকলেও মুখের বদলে যাওয়া রঙ আমার চোখে ধরা পড়ল। মুখের হাল্কা হাসিটিও মিলিয়ে গেল । সামলে নিয়ে বলল, 
- ও, আচ্ছা। সে তো অনেক দিন আগের কথা। 

- হ্যাঁ, ম্যাম, সেখান থেকেই চিনি। কিছু যদি মনে না করেন, আপনার নামটি জানতে পারি কি?

একটু ইতস্তত করেও বলল, 
- অনন্দিতা রায়। 
আমি মনে মনে হিসেব করে নিলাম, অর্ণব আর অনিন্দিতা, কী সুন্দর মিলত। আজ দুজন, কে কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে। 
- তাহলে ম্যাম, আপনি এখন এখানেই জব করছেন। 
- হ্যাঁ, এখানেই আছি। 
- আর গভমেন্ট জবের জন্য চেষ্টা করছেন না?
আবার সেই শক্ত চোয়াল। উত্তর এল, 
- না, আর করছি না। 
আমার মন অন্য কথা বলছিল, এ মেয়ে ছাড়েনি, চেষ্টা চলছে, কিন্তু প্রকাশ করছে না। নিশ্চয়ই অন্য কোনও গল্প সৃষ্টি হয়েছে। বললাম, 
- ও, আচ্ছা ম্যাম, আর ম্যাম আপনার হাসব্যান্ড? 
এই কথা বলায় সে আরও গম্ভীর হয়ে যায় আর বলে, 
- আপনি প্লিজ বসুন, কাউন্টারে লাইন পড়েছে। 
এই বলে চলে যায়। তার যাওয়ার পথেই বলি, 
- থ্যাঙ্ক ইউ, ম্যাম, আর আপনার সময় নষ্ট করার জন্য সরি। 
- প্লিজ, আপনি বসুন। 
সে আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছে। আর কথা বলতে চায় না। আমিও গিয়ে বসলাম। কিন্তু ভেবে নিলাম, আরও কিছু জানব। যথা সময়ে বাবার ডাক আসল। আমি আর মিসেস গিয়ে রুমের সামনে দাঁড়ালাম, আমি বাবাকে নিয়ে রুমে গেলাম, খুব ঠান্ডা ঘর, এক সৌম্যদর্শন যুবক, বয়স আন্দাজ করি ৩৫ – ৩৬ হবে। যথেষ্ট উচ্চতা, ফর্সা, কোয়ালিফায়েড পার্সন, কম্পিউটারের সামনে বসে আছে, ডাক্তারের পোশাক, আমার দিকে তাকিয়ে বলল – 
- প্লিজ, সিট হেয়ার। 
আমি ওনার  থেকে একটু দূরে থাকা চেয়ারে বসলাম, সেই ঘরের মধ্যে দিয়ে আরেকটি কাঁচে ঘেরা ঘরে বাবাকে নিয়ে গেল একজন নার্স, প্রসেস শুরু হলে আমি বাইরে চলে আসি, বাইয়ে মিসেস অপেক্ষা করছিল। 
আমি আর মিসেস একটু হাঁটাচলা করতে লাগলাম আর মেয়েটির কথা বললাম ওকে। ও দূর থেকে মেয়েটিকে দেখল, আর বলল, এই তোমার গল্পের মেয়ে? তা কথা হল কিছু?
- হ্যাঁ, মোটামুটি হয়েছে, যাওয়ার আগে আবার একবার দেখা করার ইচ্ছে আছে। দেখি , কথা বলা যায় কিনা! 

বাবার টেস্ট হয়ে গেছে, এবার বাড়ি ফেরার পালা। সবে তিনজন উঠে দাঁড়িয়েছি, এমন সময় মেয়েটি আবার কাউন্টার ছেড়ে বাইরে এসেছে।  আমি সামনে গিয়ে বললাম, 
- ম্যাম, আর একটি কথা! 

ডান হাত তুলে বলল, 
- প্লিজ, আর কোনও কথা নয়। ব্যস্ত আছি। 
এই বলে চলে যাচ্ছিল। আমি দূর থেকেই বললাম,
- ম্যাম, আপনি অর্ণব বিশ্বাস কে চেনেন? 
আন্দাজ ছিল, এই নামটি এড়িয়ে যাওয়া তিতলির পক্ষে সম্ভব হবে  না। ঘুরে দাঁড়ায়, বলে- 
- কী নাম বললেন আপনি? 
- অর্ণব বিশ্বাস।
- আপনি চেনেন তাকে?
- হ্যাঁ, আপনার সাথেই দেখেছিলাম। 
- আপনার সাথে কথা হয়েছে কখনও? 
- হ্যাঁ, বলেছি।
- কোথায় থাকে এখন?
- দমদমে ফ্ল্যাট নিয়েছে। 
- কী করছে এখন?
- বি.ডি.ও. 
- ওর কন্টাক্ট ডিটেলস আছে?
- না, নেই। 
তিতলি এই কথা গুলো একনাগাড়ে বলে গেল, ওর শ্বাসপ্রশ্বাসের গতি বেড়ে গেছে, ওর চোখে আগ্রহের ছাপ। কিছুটা যেন উতলা হয়েছে। চাপা ছিল বোধহয়। না হয় ইচ্ছে করে , না হয় বাধ্য হয়ে চেপে রেখেছে। আজ বুঝি আমি কিছুটা মুক্ত করার সুযোগ দিলাম। সামলে নিল নিজেকে দ্রুত। বলল, 
- ও আচ্ছা। 
বলে অপ্রস্তুত হেসে ফেলল। আমিও সুযোগ বুঝে জিগ্যেস করে ফেললাম, 
- আপনার হাসব্যান্ডের কথা জানা হল না, ম্যাম। 
এবার মেয়েটি কিছুটা পরিচিত মানুষের মত আচরণ করল। বলল, 
- এম.আর.আই. রুমে যাকে দেখলেন, তিনিই আমার হাসব্যান্ড। ডক্টর সায়ন্তন বোস। তার সুবাদেই এখানে চাকরি। একসাথে আসি আর একসাথেই বাড়ি ফিরি। 
আমার যাওয়ার সময় হয়ে এসেছিল। বললাম, 
- এটা খুব ভালো ব্যাপার, ম্যাম। 
- তা ঠিক, বলে হাসল। 
- থ্যাঙ্ক ইউ ম্যাম, তাহলে আসি। 
- আর হ্যাঁ, আপনি কাল বিকেলেই রিপোর্ট পেয়ে যাবেন। 
- আচ্ছা ম্যাম। 
এই বলে সুরক্ষা ত্যাগ করলাম। 

একটি জানা সম্পূর্ন হল। মনে হচ্ছিল, এই গল্পের এখানেই শেষ নয়, তিতলির চোখ অন্য কথা বলছিল। ওর সেই জেদ, সংকল্প, দৃঢ়তা আমি দেখেছি, এই মেয়ে নিশ্চয়ই ওর স্বপ্ন পূরনের জন্য লড়ছে, হ্যাঁ, আজও লড়ছে। ও রিসেপশনিস্ট হয়ে জীবন কাটানোর মেয়ে নয়। 
যে প্রশ্নগুলোর আজও উত্তর পেলাম না, যেমন,  ও কেন বিয়ে করে নিল অন্য ছেলের সাথে, কেন পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে প্রাইভেট জব করছে, অজানাই থেকে গেল। 

যদি কোনওদিন এই সব প্রশ্নের উত্তর পাই আর মেয়েটির সাফল্যের কথা কোনওভাবে জানতে পারি, সেদিন এই গল্পের ষষ্ঠ  দৃশ্যটি লিখে ফেলব।
......................................................

Saturday, February 15, 2020

ভ্যালেন্টাইন শুভেচ্ছা

ভ্যালেন্টাইন শুভেচ্ছা। 
=============

সদ্য কৈশোর পেরোনো যে ছেলেটা
পড়াশুনার ইতি টেনেছে সংসারের চাপে 
বন্ধুদের সাথে সময় কাটানোর আনন্দে 
ছেদ পড়েছে, টিউশানি বা পার্ট টাইম জবে, 
হাজার গিফট স্টোর পাশ কাটিয়ে 
ওষুধের দোকান খুঁজে ফেরে যে চোখ,
তারুন্যের উচ্ছ্বলতা ম্লান করে শূন্যতা 
ঠাঁই নিয়েছে যে দৃষ্টিতে,
শুভেচ্ছা রইল তার জন্য। 

সদ্য যুবতী হওয়া যে মেয়েটি 
প্রতিদিন সেলাইয়ের কাজে যায়, 
সূচবিদ্ধ যে আঙ্গুলে কেউ চুম্বন করে নি, 
যার শিরা ওঠা হাত কারো ভাল লাগেনি, 
যে হাত কোনও প্রেমিকের কাঁধে ভরসা পায়নি,
যে হাত পরম মমতায় স্পর্শ করেছে 
অসুস্থ বাবার কপাল, 
পরিশ্রমে জীর্ণ হওয়া যে শরীর
আলিঙ্গন পায়নি কোনও আশ্বাসের,
শুভেচ্ছা রইল তার জন্য। 

সংসারের চাপে যে মানুষের 
সূর্যোদয় দেখা হয় না, 
গুলিয়ে ফেলেছে যে আজকের তারিখ, 
মাঝ রাতে বাড়ি ফেরা যে পিতা 
ঠিক মনে করে আনে ছেলের ওষুধ, 
কাজ সেরে ক্লান্ত যে মা 
ঠিক ঢেকে রাখে ছেলের রাতের খাবার, 
শুভেচ্ছা রইল তার জন্য। 

রবীন্দ্র, 
১৪/০২/২০১৮।

Thursday, February 13, 2020

প্রনাম স্যার.....

প্রণাম নেবেন স্যার,  ভাল থাকবেন,  সুস্থ থাকবেন। 
আমাদের সময়ে স্কুলের সবথেকে ফিট, হ্যান্ডসাম আর স্টাইলিশ স্যার আপনি। সেজন্য আলাদা ভাল লাগা ছিলই। আর পড়ানোর সাথে মজাও চলত অনেক। কেমিস্ট্রির অনেক কিছু শিখেছি আপনার থেকে। ল্যাবে হাতে ধরে সবাইকে শিখিয়েছেন অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা।  HS এর ফাইনাল exam এ ল্যাবে আমাদের অনেককে সাহায্য করেছেন। ভাল নাম্বার দিয়েছেন। ভুলিনি কিছুই। 
আর আপনার আরও একটি ভাল লাগার জায়গা স্পোর্টস।  যারা খেলাধুলায় ভাল ছিল, তাদের আপনি খুব ভালবাসতেন, ডিটেলস খোঁজ খবর রাখতেন। কে কোন পজিশনে খেলে, সে সব জানতেন। আপনি নিজেও খেলতেন। আপনাকে ক্রিকেট,  ভলিবল খেলতে দেখেছি।
স্কুলের annual sports এ আপনার special performance থাকত। সাথে মনীন্দ্র স্যারের জাম্প। খুব ভাল লাগার সময় এগুলো। স্কুল ছেড়েছি ২০০০ সালে। মনে হয় এইত সেদিন।  
আপনার ব্যক্তিত্ব কে এমনিতেই শ্রদ্ধা করতাম। আলাদা করে কোনদিন বকা শুনিনি বা মারও খাইনি। 

আবার বলি, ভাল থাকবেন স্যার। সমৃদ্ধ হয়েছি আপনার আর আপনার মত আরও স্যারের সান্নিধ্য পেয়ে, আমি আর আরও হাজার হাজার ছাত্র। 

এ পাওয়া জীবনের শ্রেষ্ঠ পাওয়া। 
প্রনাম নেবেন স্যার।🙏🙏🙏

ধ্বংসের ছন্দ

।। ধ্বংসের ছন্দ।।

জীবন, ছন্দহীন, 
শব্দেরা মুঠোয় ধরা পাখি 
উড়তে মানা নেই
তবু যত্নে ধরে রাখি।

অতিক্রান্ত কাল
মুহূর্তের শব্দের মত
সময়ের নিস্তব্ধতা 
আগলে রাখা স্বপ্ন যত।

আশারা হোঁচট খায়
স্পৃহা যত পদপিষ্ট, 
কাব্যেরা বন্ধ দ্বারে
ধ্বংসাবশেষ অবশিষ্ট। 

জীবনযুদ্ধ থামতে চায়
এলোমেলো নয় শব্দ যত,
ছন্নছাড়া আলোর নেশায়
লাগামহীন ধ্বংসের ক্ষত।

বনগাঁ,  ২২.৫.২০১৯

সত্য - মিথ্যে

।।  সত্য - মিথ্যে  ।। 

তোমার স্নিগ্ধ মিথ্যে আমি উপহার চাই না,
তিক্ত সত্য দিও, বুকে আগলে রাখব
তোমার মিথ্যে মায়ার চোখে আমাকে দেখোনা
নির্মম রুক্ষ রক্তচক্ষু দিও, চোখে হারাব।

এ বুকের ঝড়ে মাথা রাখো, সে আমি চাইনা
খড়কুটো ধরে বাঁচার চেষ্টা,  ভুলেছি কত আগে
তুমি জোৎস্না হয়ে ফিরে আসো, সে আর চাইনা
নিকষ কালো হয়ে আসো, সে আশাই জাগে।

ইচ্ছে ডানায় ভর করে তেপান্তরের পাড়ে 
তোমাকে সাথে নিয়ে আর হারাতে চাইনা,
আকাশ চিরে রক্তস্নান, উত্তাল নদীর ধারে
ফেলে আসা গোধূলির টুকরো, ফেরৎ চাইনা।

মিথ্যে টাকেই সত্যি বলে, ডাকব আর একবার,
যদি কাছে আসতে চাও, এসো কাছে, বাধা নেই
বৃষ্টি গুড়ো মাথায় নিয়ে ভিজব না হয় আবার
ঠিকানা চাও, বলে দিচ্ছি, আমি কোথাও নেই।

২৮.৫.২০১৯, ব্যারাকপুর।

বিষ রোপণ

।।   বিষ-রোপণ  ।। 

যে বিষ তুমি দিলে আজ আমার বুকে
গ্রহন করেছি, ধারণ করেছি নিঃশর্তে
তোমার শত অনুযোগ, হয়ত যাবে চুকে
জীবনের সব হিসেব-নিকেষ, এক মুহূর্তে। 

না বলা কথায়, দৃষ্টি যখন বাধা পায়
জমাট শূণ্যতা, আর সীমাহীন আকাশের মাঝে
নীরবতার ভাষাও যখন বাকশক্তি হারায়,
আমার নানা রঙের আকাশ অন্ধকারে সাজে।

তোমার দেওয়া গরল উপহার, আকন্ঠ আমার
শিরায় শিরায় তারই স্রোত বয়ে চলে অবিরাম
নিঃশব্দে ক্ষয়ে যায়, রুদ্ধ হয় সম্পর্কের দ্বার,
খুঁজে চলি ভালোবাসা, হারানো স্পর্শের দাম।

মৌনতা আমার চতুর্দিকে, হিমালয়ের মত 
শীতলতা, কঠোরতা আমাকে রেখেছে ঘিরে,
সাজিয়ে দিয়েছ  জীবন, নিজের মনের মত
ভুলে যেওনা,সত্যি বিষ, তুমি পাবে ফিরে।

হারবে তুমি, জিতব আমি, তা বলছি না
বৃথা কথার আড়ালে, আর করব না তর্ক,
কথার ভাঁজে অট্টালিকা,  চাইতে পারিনা, 
তুমি আমি জিতব সবাই, হারবে সম্পর্ক। 

২৯.৫.২০১৮
হবিবপুর, নদীয়া।

বাবা....

অনেক দিন পর, হ্যাঁ অনেক দিন পর,
আবার সেই চেনা গন্ধ পেলাম, তোমার পাশে শুয়ে,
কত পরিচিত, কত না আপন সে গন্ধ,
সারাদিনের কাজের শেষের, ক্লান্ত অবসন্ন দেহের
ভেজা ঘামের গন্ধ, আমার খুব আপন, 
কত বার খুঁজি, কত বার হাতরাই, অজান্তেই,
বারে বারে ছুঁতে চাই, সেই ভেজা শরীর। 

মিথ্যে বলা মানুষটা, খুব আপন আমার, 
জানি, কোন জাদুদন্ড নেই তোমার হাতে, তবু
জাদুকর তুমি আমার কাছে, চাহিদা পূরনের কারিগর,
অনেক অভিযোগ আছে আমার, তোমার কাছে,
কেন এত মিথ্যে বল?
কেন বল, আমি কখনও ক্লান্ত হই না, 
কেন বল, আমি সবসময় ভাল থাকি,
কেন বল, আমার কোন অভাব নেই,
কেন বল, আমি কখনও কাঁদি না, 
কেন বল, আমি একলা ঘরেও ভাল আছি, 
কেন? কেন? কেন? 

তুমি যখন ঘুমিয়ে ছিলে, আমি তোমার পাশেই ছিলাম,
ঘুম আসছিল না, তোমাকে দেখছিলাম,
আমার কত দিনের পুরোন অভ্যাস, 
তোমাকে জড়িয়ে ঘুমানোর, 
আজ জড়িয়ে ধরতে পারলাম না, 
তোমার মাথায় হাত রাখলাম, আসতে করে, যাতে জেগে না যাও,
ওভাবেই থাকলাম কিছুক্ষণ,  শান্তি, কী শান্তি।  

তুমি উঠে যাওয়ার পর, তোমার বালিশে মুখ রেখে শুলাম,
বুক ভরে ঘ্রাণ নেব,  তাই, 
তোমার স্পর্শ মাখা ঘ্রান, 
বড্ড প্রিয় আমার।

হ্যাঁ,  বাবা বড্ড ভালবাসি তোমায়, 
তোমার মিথ্যে গুলোকেও খুব ভালবাসি, 
সবাইকে ভাল রাখতে তোমার নিজের ভাল থাকার অভিনয়, 
সেটাও খুব ভালবাসি। 
ভাল থেকো বাবা আমার।

রবীন্দ্র, ১৭.৬.১৮

এভাবেও জীবন চলে

# জীবন 
হ্যাঁ, এভাবেও জীবন চলে, না চলে না, চালাতে হয়, বাধ্য হয়ে চালাতে হয়। ট্রেনে দেখা পেলাম, অফিস যাওয়ার পথে, রানাঘাট - বনগাঁ লোকাল। স্বামী - স্ত্রী,  একসাথে, হাতে হাত ধরে লোকাল ট্রেনে বাদামের খাঁজা বিক্রি করছে। শক্ত মুঠোয় হাত ধরা, স্বামীকে যেন কিছুতেই হাতছাড়া করতে চায় না এই দুর্বল শরীরের, কঠিন মানসিকতার মহিলা। আর হাত ছাড়বেই বা কিভাবে, তার স্বামী অন্ধ, হাতে ঝোলানো ব্যাগ ভর্তি বাদামের খাঁজা, মুখে দুর্বল কন্ঠে আহবান,  বাদামের খাঁজা নেবেন, বাদামের খাঁজা, পাঁচ টাকা পিস। না, এই ডাক অস্বীকার করার ক্ষমতা আমার ছিল না, আমার মত আরো অনেকেই এক মৃদু ডাক অস্বীকার করতে  পারেনি। অনেকেই দশ টাকার নোট বাড়িয়ে বলেছে আমাকে দুটো দিন। না, তারা কেউই ট্রেনে বসে বাদাম খায়নি, ব্যাগে রেখে দিয়েছে, হয়ত পরে খাবে। 

প্রতিবার টাকা হাতে নেওয়ার পর ওই স্ত্রী টাকাটি মাথায় ঠেকিয়ে স্বামীর হাতে দিচ্ছিলেন, স্বামীও সেটি মাথায় ঠেকিয়ে ব্যাগে রাখছিলেন। এভাবেই তারা হয়ত তাদের প্রতিটি ক্রেতাকে প্রনাম করছিলেন, ধন্যবাদ দিচ্ছিলেন। 

পরের স্টেশন আসতেই তারা কামরা বদল করলেন। আবার সেই শক্ত মুঠি, স্বামীকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়া। এ যেন পথ শেষ না হওয়া পথের গল্প। 

না, কোনও ছবি তুলে রাখিনি, দ্বিতীয় বার দেখলেই চিনতে পারব, এ পথে আমার আসা যাওয়া আছেই। যখন আবার দেখব, তাদের যেন হাসি মুখে দেখতে পাই। 

ভাল থাকুক, নাম না জানা ভাই বোনেরা। এ শুধুই প্রার্থনা,  আমরা সবাই জানি, এ জীবন কেমন জীবন। তবু আশা রাখি, এভাবেই ভালোবাসা বেঁচে থাকুক, দাম্পত্য বেঁচে থাকুক, বিশ্বাস বেঁচে থাকুক, নির্ভরতা বেঁচে থাকুক,  সংগ্রাম বেঁচে থাকুক,  সুখ, ভালোলাগা বেঁচে থাকুক  আর সর্বোপরি জীবন বেঁচে থাকুক।

৬ টি বছর পার হল...

৬ টি বছর পার হল...

হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছ, আমাদের বিয়ের ছ'টি বছর পার হল, আজ ১৮ ই নভেম্বর,  ২০১৯। সেই কবে, ২০১৩ সালে,  আজকের দিনে আমাদের বিয়ে হয়েছিল, প্রথম দেখার প্রায় ৭ মাস পরে। আর এই দেখা আর বিয়ের মাঝের ৭ মাস, সে খুব সুখের সময় হওয়ার কথা ছিল, আমার ক্ষেত্রে হয়নি, পারিবারিক কারনে, চেনা মানুষের অচেনা আচরন, আমার সিদ্ধান্তকে সমর্থন না করা, পাশ থেকে সকলের সরে যাওয়া, বাড়ি ছেড়ে ভাড়া বাড়ি যাওয়া, একাকী জীবনযাপন, নিঃসঙ্গতা,  জীবনটিকে খুব এলোমেলো করে দিয়েছিল। আজ যখন আবার পিছনে তাকাই, খুব অবাক হই, হিসেব মেলে না, মেলাতে পারি না, আর জীবন কবেই বা আর হিসেব মেনে চলে। 

তবুও সব কিছুর মাঝে এক টুকরো আলো, খোলা হাওয়া, মন ভাল করা কথা, ভরসা দেওয়া একটি মন সর্বদা পাশে ছিল, সেই মেয়েটি। যাকে ভালোবেসেছিলাম। তখনও বিয়ে হয়নি আমাদের, কিন্তু তখন থেকেই ও আমার সর্বক্ষণের সাথী,  আমার বন্ধু, আমার ভরসা। প্রায় ৬৫ কিমি দূরে থাকলেও ও সর্বদাই আমার কাছাকাছি থাকত, এক সেকেন্ডের জন্যও ওর সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হত না। 

তখন Android আমার ছিল না। কিন্তু এসএমএস আর কল প্রায় ১৮ ঘন্টা চলত। প্রথম হেডফোনের ব্যবহার সেই সময় শুরু করি, প্রথম এসএমএস প্যাক তখন নেওয়া শুরু করি আর প্রথম ভোডা টু ভোডা unlimited pack আর পরে Docomo to Docomo unlimited pack ব্যবহার শুরু করি। সে এক দারুন সময়। তখন তো আর জিও আসেনি বা Airtel ও  আজকের মত  Unlimited হয়ে যায়নি। ২৩৫ টাকায় unlimited কল ২৮ দিন। তাতেই চলত সারা দিন কথা আর অফিসে লোকজন আর কাজের মাঝে চলত SMS. 

অফিসে তো কয়েকজন বলতেই শুরু করে দিল, রবিনকে তো আগে কখনো ফোন ঘাঁটতে দেখতাম না, কী হল রবীনের, সারাক্ষণ ফোন ঘাঁটছে।  আর তখন আমার ছিল নোকিয়ার আশা 510 বা এই ধরনের কিছু একটা। মেয়েটির সাথে এক মুহূর্তের জন্য যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হতে পারতাম না। ভালোবাসতাম যে!! আর এখন কী ভালবাসিনা?  বলছি সে কথা। 

এই ছটি বছরে আমরা নানা ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে গেছি, আজও যাই, হয়ত কম বেশি সকলেই যায়, যেতে হয়, তবুও ভালবাসা আজও প্রানবন্ত,  চেষ্টা করি বুঝতে, মনের অনুভূতি গুলোকে অনুধাবন করার চেষ্টা করি, তবু জানা সম্পূর্ণ হয়ে ওঠে না। হয়ত এভাবেই আমরা একে অন্যকে জানার চেষ্টা করতে করতেই অনেক বছর কাটিয়ে ফেলব। আর ভুল বোঝাবুঝি,  সে তো বোঝার চেষ্টা করার অংশ।  

আজ যখন সেই মেয়েটির কথা ভাবি, তখন মনে হয়, ওকে আরও কিছুটা যত্নে রাখা প্রয়োজন,  আর একটু সময় দেওয়া, আরও একটু যত্ন নিয়ে কথা বলা, ওর কথার প্রতি মনোযোগী হওয়া দরকার ছিল। সেই যত্নে থাকা মেয়েটি আজ কিছুটা  যেন অবহেলিত,  সংসারের নানা কাজের চাপে আর বাচ্চা সামলাতে সামলাতে মেয়েটি আর নিজের খেয়াল রাখতেই পারে না। তাই বলে ওর স্বামীর যত্নে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য নেই। নিজের শরীরের খেয়াল না রাখলেও ও আমার খুব খেয়াল রাখে, আমি বুঝি, কিন্তু প্রকাশ করি না। সেই বিয়ে হওয়ার আগের খেয়াল রাখা আর আজকের মধ্যে আমি তফাৎ দেখি না। 

আর আজকের দিনটি আমি আলাদা করে কিছুই করিনি। সত্যি বলতে কি, ১৮ তারিখ মাথায় ছিল, কিন্তু আজ যখন ঘুম থেকে উঠি, আজকের তারিখ টাই মনে ছিল না। মেয়েটি সেই কোন ভোরে উঠে সব কাজ সেরে আমাদের মেয়েকে গুছিয়ে রাখে, আর আমি বেলায় ঘুম থেকে যখন উঠলাম, মেয়েটি বলল, আজ অফিস না গেলে হয়না? আমি বললাম, সে কি করে হবে, অফিসে অনেক কাজ রয়েছে, আর আজ সোমবার, আমি কথা দিয়ে এসেছি, সোমবার আসব, তাই না গেলে হবেনা। 

মেয়েটি বলল, আগে তো এক আধ দিন অফিসে যেতে না করলে শুনতে, আর এখন অফিসে যাওয়ার এত ধুম পরে গেল যে! তুমি যে বলো, অফিসে আর কোনও কাজ নেই! আমি হেসে ফেলি আর বলি, না, আমার কাজ আছে। যাই, যেতে হবে। মেয়েটি কিছু না বলে আমার স্নানের জল,  টিফিন ইত্যাদি গোছাতে চলে গেল। 

আমিও যথারীতি অফিসে চলে এলাম। অফিসে এসে ফেসবুক খুলতেই Memory চলে এল। ব্যাস। মনটা একটু হলেও খারাপ হয়ে গেল। গত ৫ বছর প্রতিবার বাড়িতেই ছিলাম একসাথে। এবার আর হল না। আবার,  এমনিই, আজ সোমবার, আমি ব্যারাকপুর অফিস করি, নৈহাটি থাকি, কাল আবার ব্যারাকপুর,  তাই আর হবিবপুর ফিরিনা, লম্বা পথের অনেকটা দাঁড়িয়ে যাতায়াত করতে পারিনা, আর চাইও না। 

তাই ওকে আজ একটু যেন বেশি মিস করছি, সাথে আমদের ছোট্ট ছানা আছে একটা, ওকেও। 

যাইহোক, অনেক কথা লিখলাম। কিন্তু ফেসবুকে কেন? ফেসবুক তো আমার বৃহত্তর পরিবার, আমার সব কাছের মানুষ তো ফেসবুকেই আছে, তাই সবার সাথে ভাগ করে নেওয়া। 

আর এতক্ষণ যে মেয়েটির কথা বললাম, সে সেই মেয়েটি, যাকে ছবিতে দেখে ভালবেসেছিলাম, আর বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। সেই প্রথম ছবিটি যদি পাই, শেয়ার করব।।

পেয়েছি, সেই প্রথম দিনের ছবি, আমাদের বিয়ের আগের। 

আর তোমাকে ভাল থেকো বলার কোনও অর্থ হয়না, বরং বলা ভাল, ভাল রাখব। তুমি তো সবাইকেই ভাল রাখার চেষ্টা কর।

পুরুষ তুমি এভাবে ছোঁবে

পুরুষ তুমি ছুঁতে চাইলে এমনিভাবে ছোঁবে।।

এই যে বাসে ট্রেনে, রাস্তাঘাটে, ভীড়ের ঠ্যালাঠেলিতে তুমি আমায় ছুঁয়ে দাও, তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই। এমন তো কতবার হয়েছে। কতজনে কতভাবে তাকিয়েছে, ছুঁয়েছে। একবার জানো কি হল? তখন বয়সটা বেশ অল্প। কলকাতায় লোকাল ট্রেনে চেপেছি। একটাই মাত্র স্টেশন মাঝে, কিন্তু একেবারে চাপাচাপি ভীড়। কোনরকমে ট্রেনে পা রাখতেই ট্রেন ছেড়ে দিল। আমি ঝুলছি ট্রেনের বাইরে। কোনরকমে একটা লোহার রড ধরে আছি, কিন্তু ঘাম ঘাম হাতে তাও পিছলে যাচ্ছে। হঠাৎ একটা পুরুষালি হাত কনুইয়ের কাছটা ধরেই হ্যাঁচকা টানে ট্রেনের ভেতরের দিকে নিয়ে এল আমাকে। আমি বললাম, "প্লিজ ছাড়বেন না। আমি পড়ে যাব তাহলে।" 
"ছাড়ছি না। ভয় নেই।" ভয় ছিল না আর।
আরেকবার। সেবার গায়ে জ্বর। মাথায় কি ঘুরছিল, চট করে হোস্টেল থেকে বাড়ি যেতে খুব ইচ্ছে হল। ট্রেন নেই, কোন ভাল বাস নেই। ঝরঝরে একটা বাস যা পেলাম উঠে পড়লাম। তিলার্ধ জায়গা নেই বাসে। আমি গায়ে জ্বর নিয়ে ধুঁকছি দরজার কাছটায়। পিঠের ওপর হাত পড়ল। একজন গ্রাম্য বৃদ্ধ। বললেন, "বসবে মা? আমি দাঁড়াতে পারব না। এই পাশটায় বস কষ্ট করে।" পাশে জায়গা ছিলনা তেমন। আমার মাথা তোলারও ক্ষমতা ছিল না। রীতিমত ওনার পায়ের ওপরে বসে পড়লাম। জানলার হাওয়া চোখেমুখে লাগল। আঃ শান্তি!
এরকম হয় কিন্তু। রাস্তাঘাটে কেউ কেউ হাঁ করে তাকিয়ে দেখে। অস্বস্তি হয়। আমারও হয়। কিন্তু কখনো কখনো খুব ভাল লাগে। একবার যেমন। কোথাও যাচ্ছিলাম, বই পড়তে পড়তে বাসের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছি। শেষ স্টপেজে এসে কন্ডাক্টর ডেকে তুলল। চেয়ে দেখলাম একটা গন্ডগ্রাম। আর একটি ছেলে আমার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। আমি পাত্তা না দিয়ে বাস থেকে নেমে পড়লাম। বিকেল হয়ে এসেছিল। কন্ডাক্টর বলল এরপর বাস আবার দু'ঘন্টা পর। একা একা দাঁড়িয়ে আছি। ভাবছি কি করব। দেখি পেছনে ঐ ছেলেটিও এসেছে। 
"এখানে একটা দোকানে আমার বাইক রাখা থাকে। আমি পৌঁছে দেব?"
"না না। কি দরকার।"
"ভয় নেই। বাড়ি অব্দি পৌঁছে দেব। পরের বাস আসতে আসতে রাত।"
কি মনে হল! বললাম "চলুন।" 
"ভাল করলে ধরে বসুন তো। চাপ নেই।" বসলাম।
আমাকে ঠিকানা জিজ্ঞেস করে একদম বাড়ির দরজা অব্দি পৌঁছে দিয়ে গেল। আবার মাকে বলেও দিল, "বলুন কাকিমা, বাসে ওভাবে কেউ ঘুমিয়ে পড়ে?"

এই তাকিয়ে থাকাগুলোও বেশ লাগে তো। তারপর কেউ যদি এমনি এমনি আদর করে, ধর অচেনা কেউ, আমার তাও  ভাল লাগে।
তখন সন্তানসম্ভবা আমি। দূর্গাপুজোয় লাইনে দাঁড়িয়ে অষ্টমীর প্রসাদ নিচ্ছি। খুব গরম। হাঁসফাঁস করছি। এক চল্লিশোর্ধ এগিয়ে এলেন। একটা প্লাস্টিকের চেয়ারে আমায় বসিয়ে ভোগ নিতে গেলেন। একটু পরে এসে ভোগের খিচুড়ি, পায়েসের প্লেট আমার হাতে দিলেন। যাবার সময় গালে আলতো ছুঁয়ে বললেন, "এই অবস্থায় অত রোদে কেন দাঁড়ালে? মুখটা দেখ, মা দূর্গা যেন।"
তারও অনেকদিন আগে, বেশ পাঁচ-ছ'বছর আগের ঘটনা। জীবনে প্রথমবার রেডিওথেরাপি নিচ্ছিলাম, এই দিনদশেকের। তখন জানতামই না এর কি মাহাত্ম্য। ব্যাঙ্গালোরে থাকি। বিদেশ বিভূঁয়ে বদনাম করার লোক পাওয়া যায়, পাশে থাকার লোক কম।
প্রথম দুদিন বেশ নাচতে নাচতে থেরাপি নিলেও তৃতীয় দিনে এসে অবস্থা কাহিল। এরকমই একদিন থেরাপির জন্য অপেক্ষা করছি, অফিসের এক কলিগের ফোন এল। খুব কাছের নয়, মোটামুটি বন্ধু। জিজ্ঞেস করল কোথায় আছি। বললাম থেরাপি নিচ্ছি। আঁতকে উঠে বলল, "রেডিওথেরাপি চলছে, বলনি একবার?"
হসপিটালের নাম জিজ্ঞেস করল। সেদিন থেরাপি সেরে বাইরে এসে দেখি রিসেপশনে দাঁড়িয়ে আছে। 
মাথায় একটা চাঁটি মেরে বলল, "আইডিয়া আছে কোনো কি হচ্ছে? এবার থেকে আমি আসব সাথে, খবরদার আসবে না একা।" সেদিন চোখের জলটা আর দেখতে দিই নি।

ছুঁতে হলে এমনি করে ছোঁও। এমন করে, যাতে শেষ দিন অব্দি তোমার ছোঁয়াটুকু মনে করে রাখতে পারি। গর্ব করে, আনন্দ করে বলতে পারি তুমি একটু হলেও অনেকখানি  ছুঁয়েছিলে আমাকে। এখনও ছুঁয়ে আছো। প্রত্যেকবার এমনি করে ছুঁও। সত্যি বলছি, আমার ভাল লাগে। আমি কিচ্ছু মনে করি না।

(সংগৃহীত)
 লেখাটা post করার পর comment থেকে জানতে পারলাম লেখিকার নাম নুপুর চক্রবর্তী।ধন্যবাদ জানাই ওনাকে।

কথোপকথন

কথোপকথন 
....................................................

ল্যাপটপে বসে ইউটিউব দেখছিলাম, একটি আমার প্রয়োজনীয় বিষয় মন দিয়ে দেখছিলাম। দু হাত দূরে আমার মেয়ে বসে ব্লক নিয়ে খেলছিল। হঠাৎ মেয়ে বলে বসল, বাবা, আমি গান শুনব, তুমি ল্যাপটপে গান চালাও। আমি মোবাইলে চালানোর কথা বললে রাজি হল না। ল্যাপটপেই চালাতে হবে। 

- মা, আমি একটু কাজ করছি, একটু পরে চালাচ্ছি, তুমি তো খেলছ, খেলে নাও, আমিও কাজটি করে নি। 
- না বাবা, তুমি এখনি চালাবে। 
- মা, আমাকে এক মিনিট সময় দাও, তারপরেই চালাচ্ছি।
- চালাও না বাবা। 

আমি খুব শান্ত ভাবে বললাম,  একটু পরে চালাচ্ছি বাবা।

এবার ও রেগে গিয়ে, 

- চালাবে কি চালাবে না? 
আমি আবার শান্ত ভাবে, - চালাচ্ছি বাবা, একটু পরে। 

ও আরও রেগে - হাতে থাকা ওর কলমটি দেখিয়ে, 
- আমি কিন্তু তোমার পায়ে পেন ফুটিয়ে রক্ত বের করে দেব, চালাও বলছি, দিলাম পেন ফুটিয়ে। 

এবার আমি ভিডিওটি থামিয়ে ওর দিকে শান্তভাবে তাকালাম আর বললাম, 

- কি করবে মা তুমি?
- পেন ফুটিয়ে রক্ত বের করে দেব।

আমি পা বাড়িয়ে দিলাম আর শান্ত ভাবে বললাম, 
- এই নাও, মা, পা দিয়েছি, তুমি পেন ফুটিয়ে দাও।

মেয়ে চুপ। 
আবার বললাম, 
- দাও মা, পা দিয়েছি আমি, তুমি রক্ত বের করে দাও। 

মেয়ে মাথা নীচু করে নিয়েছে। 

আমি আবার বললাম, 
- মা, তুমি পেন ফোটাবে না? 

মেয়ে চোখ তুলে তাকালো। 

দু চোখে জল টলমল করছে, এই বুঝি পড়বে। 

আমি কোলে তুলে নিলাম, কোলে বসিয়ে বললাম,

- বাবা, তুমি কষ্ট পেলে?

মেয়ে সম্মতি সূচক ঘাড় নাড়ল। আমি বললাম, 
- তুমি বাবার পায়ে পেন ফোটালে না কেন, মা? 
- তোমার ব্যথা লাগবে।
- বাবাকে ব্যথা দিতে কষ্ট হয়? 
- হ্যাঁ, বাবা। 
- তুমি কাঁদছ কেন?
- কাঁদছি না, বাবা। খেলছিলাম তো, চোখে কী যেন ঢুকেছে। 

আমি আরও শক্ত করে মেয়েকে জড়িয়ে ধরলাম, চোখের জলটি মুছে দিয়ে বললাম, কোন গান শুনবে বাবা। 
- সকালে যেটা চালিয়েছিলে, সেটা। 

আমার তিন বছরের মেয়েও কষ্ট লুকোতে শিখেছে, চোখের জল লুকোতে শিখেছে, মিথ্যে বলতে শিখেছে , ঠিক যেভাবে একজন পরিণত মানুষ নিজেকে আড়াল করে, লুকিয়ে রাখে, নিয়ন্ত্রন করে। 

এ এক নতুন উপলব্ধি। 

আর এখন? মেয়ের সাথে ইউটিউবে ভূতের গল্প দেখছি।

আলিঙ্গন দিবস

আলিঙ্গন দিবস 

............................

প্রতিদিনের অভ্যাস, সকালে ঘুম থেকে দেরি করে উঠে খুব তাড়াতাড়ি অফিসের জন্য রেডি হয়েই ট্রেন ধরার জন্য দৌড়।  বাইক মোটামুটি ভীড় রাস্তাতেও অনায়াসে ৫০ পার করে। আমি আর ট্রেন একই সাথে প্লাটফর্ম স্পর্শ করি। মাঝে মাঝে আবার চোর পুলিশের খেলা হয়। ও আমার একটু আগে এসে পরে আর প্লাটফর্ম ছুঁয়ে চলে যায়। সেদিন মহা ভোগান্তি আমার আর যারা আমার অপেক্ষায় থাকে, তাদেরও।  সে নিয়ে নয় অন্য কখনো লিখব। 

আমার ট্রেন সেই একই আছে। হবিবপুর থেকে ৯ টা ১০। ট্রেন খুব ফাঁকা থাকে, এটি বনগাঁ যায়। আর আজ আমারও গন্তব্য বনগাঁ অফিস। তাই আর নামার প্রশ্ন নেই, সোজা এক ট্রেনেই বনগাঁ চলে যাব। খুব আনন্দের জার্নি। 

অভ্যাসবশেই ট্রেনে উঠেই মোবাইল খুলে ফেসবুক খুলে একটু চোখ বুলিয়ে নেওয়া। টাইমলাইন জুড়ে Hug Day নিয়ে লেখালেখি।  খুব ভাল। আমার আবার কোনও দিনই ওই সব দিবস টিবস মনে থাকে না, আর যেহেতু জীবনে গুছিয়ে প্রেম করা হয়ে ওঠেনি,  ওই সব দিন নিয়ে মাথাব্যথাও ছিল না, আর আমার কাছে কারো জড়িয়ে ধরার আব্দারও ছিল না। যাক সেসব কথা। 

ট্রেন রানাঘাট থেকে বাঁদিকে টার্ন নিচ্ছে, বনগাঁর দিকে। ৩ নাম্বার প্লাটফর্ম স্পর্শ করল। আমি জানলার ধারে। ডান দিকে প্লাটফর্ম আর বাঁ হাতে অনেক ফাঁকা রেললাইন আর মালগাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। আমার চোখ মালগাড়ি গুলোকে দেখছে। একটি মালগাড়ির নীচে গিয়ে আমার দৃষ্টি স্থির হয়। 

একটি ছোট্ট সংসার বলা যেতে পারে, সেই গাড়ির নীচে। তিনটি প্রানী, আর হ্যাঁ, তিনজন মেরুদন্ডী প্রানী, স্তন্যপায়ী প্রানী, দুপায়ে হাঁটে, হ্যাঁ, তিনজন মানুষের কথাই বলছি, দুজন নারী, আর একজন শিশু। পূর্নাঙ্গ নারীর বয়স আন্দাজ করতে পারলাম না। অপ্রাপ্তবয়স্ক নারীর বয়স আন্দাজ করি পাঁচ হবে, আর শিশুটির বছর দুয়েক। তারা ভাই বোন হবে৷ আশা করি। অপরজন তাদের মা হবে, আশা করি। 

মা অসুস্থ,  সেখানেই শুয়ে আছেন। আর সেই বছর পাঁচেকের দিদির কোলে ছোট্ট ভাই, খুব জোরে ভাইকে জড়িয়ে ধরে আছে। বোধহয় ঠান্ডার থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে। সামনে ঠোঙাতে কিছু খাবার, সেখান থেকে ভাইকে খাওয়াচ্ছে। আর ভাই যখন খেয়ে নিচ্ছে, দিদির মুখে অনাবিল খুশির হাসি। পরম তৃপ্তির হাসি। সাফল্যের হাসি। ভাইকে জড়িয়ে ধরে হামির পর হামি। আমি মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম। 

ট্রেন আবার চলতে শুরু করেছে। যতক্ষণ ওদের দেখা যায়, আমি দেখার চেষ্টা করতে লাগলাম। আমাদের ফেসবুকের Hug Day এর সাথে ওদের আলিঙ্গন মেলানোর চেষ্টা করিনি। কেননা আমি ভেজাল আর নির্ভেজাল শব্দ দুটির সাথে পরিচিত। 

না জানি এমন কত আলিঙ্গনে আমরা প্রতিনিয়ত আবদ্ধ হই আমাদের আপন জনের সাথে, প্রিয়জনের সাথে, সন্তানের সাথে, বাবা মায়ের সাথে, চেনা পরিচিত মানুষ জনের সাথে। 

বেঁচে থাকুক সেই সব আলিঙ্গন,  যা কিছু পারিবারের,  বন্ধুত্বের,  ভালোবাসার, প্রেমের, স্নেহের, ভরসার, বিশ্বাসের। 

............................

প্রমিস ডে

প্রমিস ডে
......................

৯ টা ১০ এর বনগাঁ লোকালে হবিবপুর থেকে উঠেছি, সাড়ে ন'টা নাগাদ রানাঘাট স্টেশনে নেমেছি। এখান থেকে ৯ টা ৪১ এর গেদে লোকাল ধরে ব্যারাকপুর যাব, তাই মাঝের যে ১০ মিনিট সময়, জায়গা খুঁজে,  একটু ফাঁকা দেখে দাঁড়িয়ে আছি। 

সামনে একটি ছেলে, ২৮ - ৩০ বয়স হবে, পরনে বারমুডা, গায়ে গোল গলা গেঞ্জি, সাথে ব্যাগ ভর্তি লাল গোলাপ। এক ব্যাগ থেকে বের করে জল ঝেড়ে ফেলে আবার অন্য ব্যাগে রাখছে। গুছিয়ে রাখছে, খুব যত্ন করে রাখছে, মাঝে মাঝে হাতে কাঁটা বিঁধলে হাত দেখছে। আর পুরো ব্যাপারটি আমি দেখছি। 

ওর সব কাজ যখন প্রায় শেষ,  ওর সামনে গেলাম, 

- কোথায় নিয়ে বসবে এগুলো? 

ও কাজ করতে করতেই পাত্তা না দেওয়ার মত করে বলল, 
- ওই তো, ওই ব্রিজের ওপর।
- কত গুলো ফুল আছে এখানে? 
- প্রতি বান্ডিলে ১০০ করে।
আমি দেখলাম, প্রায় ১৫ বান্ডল ফুল আছে ওর কাছে। 
- কত করে বিক্রি করবে?
- সব এক দাম না, শেপ আর সাইজ দেখে বিক্রি হবে, এগুলো আবার আলাদা করতে হবে। ১০, ১৫, ২০ যেটা যেমন হবে, তেমন দামে বিক্রি হবে। 
কিছু আবার পাইকারী দরেও বিক্রি হবে। 

এবার আমার প্রশ্নের খেলা শুরু। ভিতরের মানুষটিকে জানার প্রশ্ন। 

বলে ফেললাম,
- তুমি কাউকে গোলাপ দেবে না?
এবার ছেলেটি হেসে ফেলল। একটু চুপ করে থাকল।  তারপর বলল, 
- আমিই তো দাদা সবাইকে ফুল দেই।
- সেই দেওয়ার কথা বলছি না।

বুঝেও না বোঝার ভান করছে। 
আবার বললাম, 
-বিশেষ কেউ নেই তোমার? 
- সব খরিদ্দারই আমার কাছে বিশেষ ,  দাদা। আমার ব্যবসা টাই সব। ভাল ব্যবসা হলেই আমার কাছে এটি বিশেষ দিন, আর কিছু বুঝি না। 

এবার আমার চুপ থাকার পালা। আমি কি কথায় হেরে যাচ্ছি? হ্যাঁ, হেরে গিয়েও ভাল লাগছে, যার জীবনবোধ আছে, সঠিক মূল্যায়ন আছে, জীবনকে ভিন্ন ভাবে দেখার সাহস আছে, তার কাছে হেরেও আনন্দ পাই। 

আবার বোকার মত, শুধু মাত্র কথা বাড়ানোর জন্যই  বললাম, 
- খুব কাঁটা ফুলগুলোতে।

সে আমাকে অবাক করে উত্তর দিল,

- সে যন্ত্রনা তো শুধু আমি পাই দাদা। প্রতিটি ফুল আমাকে কেটেছেঁটে পরিষ্কার করে, রাংতা মুড়ে বিক্রি করতে হয়। কাঁটার খোঁচা, সে শুধু আমিই পাই। যারা কেনে, আর একে অন্যকে গিফট করে, তারা এ যন্ত্রণা কিভাবে জানবে?  

আমার ট্রেন আসছে। আমি ছেলেটিকে পিছনে ফেলে এগিয়ে গেলাম। যাওয়ার সময় বলে এলাম, 

-ভাল থাকবে। তোমার সাথে কথা বলে খুব ভাল লাগল। প্রার্থনা করি, তোমার সব ফুল বিক্রি হয়ে যাক। 

ছেলেটি একগাল হাসি উপহার দিল। 

একটা মিশ্র অনুভূতি নিয়ে ট্রেনে উঠলাম। সত্যিই তো, ওর প্রমিস জীবনের কাছে, জীবনকে কালকের থেকে আরও একটু ভাল রাখার প্রমিস, সমৃদ্ধ হওয়ার প্রমিস, একটু ভাল ভাবে সংসার চালানোর প্রমিস, বৃদ্ধ বাবা মায়ের দেখাশোনা করার প্রমিস, প্রিয়জনের জন্য সস্তা শাড়ী নিয়ে যাওয়ার প্রমিস, ছোট্ট বাচ্চার জন্য সস্তা খেলনা কিনে নিয়ে যাওয়ায় প্রমিস, আর নিজের ইচ্ছে,  ভালোলাগা, না পারার যন্ত্রণা,  অক্ষমতা,  সীমাবদ্ধতা ভুলে থাকার প্রমিস। 

এই সকল প্রমিসের কাছে, আমাদের শখের প্রমিস ডে, ধারেকাছেও আসছে না। 

এবার আমার উদাস হওয়ার পালা।

ট্রেন ছুটছে, আমি জানলার ধারে। চোখটা জ্বলছে।  

.............

সবটা গল্প নয়।

সবটা গল্প নয়
..............................
একটি মেয়েকে প্রায়ই দেখতাম রানাঘাট স্টেশনে। না, রানু মন্ডলের গল্প নয়। একটি খুব ভদ্র, সংযত, গুছিয়ে থাকা মেয়ে, যথেষ্ট গম্ভীর, চোখে মুখে চিন্তার ছাপ, ক্লান্ত, কিছু একটা করার আপ্রান চেষ্টা, এমন একটি মেয়ে। আর পাঁচ জনের থেকে আলাদা ভাবে মেয়েটি আমার দৃষ্টি টেনে নিয়েছিল একটু আলাদা কারনে। সর্বদা মেয়েটির হাতে একটি বই থাকত। আর চোখ প্রায় সর্বদা বইয়ের দিকে , মাঝে মাঝে চোখ তুলে চারপাশটা একবার দেখে নিত। আজকাল তো বেশীরভাগ মানুষ মোবাইল নিয়েই ব্যস্ত থাকে, তাই এই ধরনের মানুষদের একটু ব্যতিক্রমী বলেই মনে হয়। 
 
আমি ব্যারাকপুর অফিস থেকে ৪টে ৩০ এ বেড়িয়ে ৪ টে ৫২ এর রানাঘাট লোকাল ধরতাম, সেটি রানাঘাট আসে প্রায় ৬ টা ১৫ -২০ নাগাদ। পরের শান্তিপুর লোকাল প্রায় ৭ টায়, আর মাঝের ৪০ মিনিট মত অপেক্ষা আর লোকজন দেখা ছাড়া আর কোনও কাজ থাকে না। আমার নিজেরও যাতায়াতের পথে বই পড়ার অভ্যাস তাই অন্য কাউকে বই পড়তে দেখলে আমারও খুব ভাল লাগে। 

আবার মেয়েটির কথায় আসি। সর্বদা পড়ছে। দূর থেকেই বুঝতে পারতাম চাকরীর পড়াশোনার জন্য কোনও ম্যাগাজিন পড়ছে। আর নিজে এত ম্যাগাজিন পড়ি বা পড়েছি যে ফন্ট আর প্রিন্টিং স্টাইল দেখেই বুঝে যাই যে কী পড়ছে। দেখলাম ও বাংলা অ্যাচিভার্স ম্যাগাজিন পড়ছে। সর্বদাই চুড়িদারে দেখেছি, মাথার মাঝারি মাপের চুল পরিপাটি করে বিনুনী করা। 

এতক্ষন যে কথাটি বলিনি, সেটি হল মেয়েটির চোখ যেমন সর্বদা বইয়ের দিকে থাকত, ঠিক সেই ভাবে একটি ছেলে সর্বদা ওর সাথে থাকত। একটি প্রানবন্ত ছেলে, সর্বদা হাসিখুশি, এই জীবন, বাস্তবতা, লড়াই, সংগ্রাম এসবের ধার ধারে না। বিন্দু মাত্র চিন্তা নেই। পরনে বেশীরভাগ দিন জিন্স – টিশার্ট, গালে যত্ন করে রাখা চাপ দাড়ি, মাথায় বড় বড় চুল, হাতে ব্যান্ড, আর সর্বদা বক বক করে যাচ্ছে। মেয়েটি কখনও মাথা নেড়ে, বা হ্যাঁ না বলে উত্তর দিচ্ছে, আবার পড়ছে। এই ভাবেই চলছিল, মাসের পর মাস, দুজনাই খুব খুশি, ছেলেটির প্রকাশ ছিল, মেয়েটির প্রকাশ ছিল না, মেয়েটি যেন একটু ভয় পেত, কেউ বুঝি দেখে ফেলল, আর জীবনে কিছু একটা করতে হবে, এমন একটা দৃঢ়টা ছিল চোখে মুখে। 

দৃশ্য – ১ 
..................।

রানাঘাট থেকে ট্রেনে উঠেছি, রাত ৭ টা, ঘটনাক্রমে ট্রেনে উঠে দেখি মেয়েটি আমার পাশে জায়গা নিয়ে দাঁড়িয়েছে, ছেলেটি তার পাশে, গেটের ধারে, গরম কাল, মেয়েটি পড়ছে, ম্যাগাজিন, অ্যাচিভার্স, বই থেকে মাথা তুলছে না। আর ছেলেটি গেটের ধারে, হাওয়ায় চুল এলোমেলো, অভ্যস্ত হাতে দ্রুত চুল ঠিক করছে। আর মাঝে মাঝে মেয়েটিকে কিছু একটা বলছে ইয়ার্কির সুরে, মেয়েটি পড়তে পড়তেই হাসছে। ছেলেটির সব কিছুতেই ইয়ার্কি, ট্রেনে হকার এলে তাদের নিয়েও কি একটা মন্তব্য করে মেয়েটিকে হাসাচ্ছে। মেয়েটি সব কিছুর মাঝেও পড়ে যাচ্ছে। চোয়াল শক্ত রেখে। 

এখানে বলে রাখি, মাসের পর মাস যা দেখেছি, তাতে বুঝেছি, ওরা রানাঘাটে একসাথে আসে না, কেননা মেয়েটিকে মাঝে মাঝে একাও দেখা গেছে অপেক্ষা করতে, পরে ট্রেনে ওঠার সময় আবার একসাথে দেখা গেছে। অর্থাৎ, ছেলেটি মেয়েটিকে নিতে আসত খুব নিয়ম মেনে, দায়িত্বশীলতার সাথে। 
যাইহোক, ট্রেন হবিবপুর এলে আমি নেমে যাই, এবং ওরা দুজনাই নেমে যায়। মেয়েটি বই বন্ধ করে ব্যাগে রাখে এবং ওরা দুজন প্লাটফর্মে নেমে বিপরীত দিকে হাঁটতে শুরু করে। ভাবটা এমন  যেন, ওরা দুজন একে অন্যকে চেনে না। 
মাসের পর মাস আমি এই ঘটনা দেখে এসেছি। 

দৃশ্য – ২
.....................

আমার রুটিন একই আছে। অফিস যাচ্ছি, ডাউন শান্তিপুর লোকাল, হবিবপুর থেকে ১০টা ২০ তে ছাড়ে। সেই মেয়েটি, বিবাহিতা, তার সেই মুখের কাঠিন্য, দৃঢ়তা, জেদ কিছুই চোখে পড়ল না, সব উধাউ হয়েছে। তার গাম্ভীর্য আজ অট্টহাসি এসে দখল করে নিয়েছে। সাথে স্বামী ছিলনা । দুজন মহিলা ছিলেন। মনে প্রশ্ন এল, তবে কি ওই ছেলের সাথেই বিয়ে করে নিল? উত্তর জানার উপায় ছিলা না। যে মেয়ের চোখ মাটি থেকে উঠত না, আজ তার চোখ পুরো কামরায় ঘুরছে। যে শরীর সংযত ছিল, আজ শরীর জুড়ে হাসির হিল্লোল। আমার অবাক হওয়ার পালা। যে মেয়েটি তার লড়াই, জেদ, দৃঢ়তার জন্য একটু হলেও আমার মনে সমীহ জাগিয়ে তুলেছিল, আজ তা ভাঙার পালা। 
মেয়েটির হাতে আজ আর বই ছিল না, শাঁখা, পলা, চুড়ি, আংটিতে ভরা ছিল আর দুহাত কনুই পর্যন্ত মেহেন্দি দিয়ে রাঙানো ছিল। ওরা রানাঘাট নেমে গেল, আর আমার যাত্রা ব্যারাকপুর পর্যন্ত বহাল থাকল। 

দৃশ্য – ৩
...........................

কয়েকমাস কেটে গেছে। আমার জীবন একই আছে। রানাঘাট থেকে ট্রেনে উঠেছি, রাত ৭ টা, বাড়ি ফিরছি, আমার মুখোমুখি সেই ছেলেটি, সেই স্টাইলিশ ছেলেটি। না, আজ আর সেই ছেলেটি প্রানবন্ত নেই, মুখে ক্লান্তি, চোখে বিষণ্ণতা, স্বাস্থ্য একটু ভেঙেছে। মাথার চুল ছোট করে কাটা, মুখে আর শখের দাড়িও নেই, পরনে সেই জিন্স – টিশার্ট, হাতে ব্যান্ড নেই। আর যেটি সবচেয়ে লক্ষণীয়, ছেলেটির হাতে বই। সেই বেপরোয়া ছেলেটি আজ যেন জীবনকে বুঝতে শিখেছে। আমার একটু কষ্ট হল। ছেলেটি আমাকে লক্ষ্য করছে, যে আমি ওকে দেখছি। এর আগেও আমি ওদের সাথে এক কামরায় বাড়ি ফিরেছি, চোখে চোখ পড়েছে, কথা হয়নি, তখন সাথে মেয়েটি ছিল, আজ একা, সাথে বই। 

আমার কী মনে হল, আমি ওর পাশে গেলাম, একটু হাসলাম, বললাম, 
- পড়ছ?
- হ্যাঁ, দাদা।
আমি ওর বইয়ের দিকে তাকালাম, দেখলাম মানোহর পান্ডের ১৪০০০+ পড়ছে। আবার বললাম, 
- কোথাও পড়ছ, না কি একাই?
- রানাঘাট জি.এস. সি. ই তে পড়ছি দাদা। 
- খুব ভাল, পড়ে যাও। 
এই বলে আমি ওর পিঠে হাত রাখলাম। 

সময় দেখার জন্য ও ফোন বের করল, আমি ওর ফোন আগেও অনেকবার দেখেছি, সেখানে মেয়েটির ছবি ওয়ালপেপারে রাখা ছিল। আজ দেখলাম, সেখানে মা সরস্বতী স্থান পেয়েছেন। ইতিমধ্যে হবিবপুর চলে এল, আমি নেমে গেলাম, ছেলেটিও নেমে গেল। 

দৃশ্য – ৪
..................... 

বছর দুয়েক পরে অফিস থেকে একটি প্রোগ্রাম আয়োজন করার জন্য স্থানীয় বিডিও অফিসে যেতে হয়েছিল। সেখানে বিডিও ছাড়াও অন্যান্য অফিসার, জেলা সভাপতি, পঞ্চায়েত প্রধানেরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান শুরু হলে বহু লোকের মাঝে ওই ছেলেটিকেও দেখতে পাই। আমার খুব কৌতুহল হল, ও এখানে কেন? তাহলে কি কোনও চাকরী পেয়েছে, না কি চাকরীর সন্ধানে সাধারন প্রার্থী হিসেবে এসেছে? ভিড় ঠেলে ওর কাছে চলে গেলাম, চোখে চোখ পড়তেই ও বলল,
- দাদা, তুমি এখানে?
- এটা তো আমাদের অফিসের ই প্রোগ্রাম।
- মানে তুমি এক্সচেঞ্জ থেকে এসেছ?
- হ্যাঁ, আর তুমি কেন এখানে? কাজের খোঁজে বুঝি?
এটা বলার পরে ও আমাকে একপ্রকার টানতে টানতে নিয়ে যেতে লাগল, 
- চলো, আমার ঘরে চলো।
- মানে তুমি বিডিও অফিসে চাকরী কর?
- আগে তো চলো।
অনেকটা ঘুরে ঘুরে বিরাট এক চেম্বারে নিয়ে গেল। 
- এই যে দাদা, এটা আমার ঘর। 
আমি নেমপ্লেট দেখলাম, যেখানে বড় বড় করে লেখা, মিঃ অর্নব বিশ্বাস, ব্লক ডেভেলপমেন্ট অফিসার। 
এই প্রথম ওর নাম জানলাম, সাথে পরিচয়। জড়িয়ে ধরলাম। 
- খুব ভাল হয়েছে ভাই, আমি ভীষণ খুশি হয়েছি। কেমন আছ বলো? 
- ভাল আছি দাদা। 
- অনেক দিন পরে তোমাকে দেখলাম।
- এখন আর হবিবপুর রেগুলার ফেরা হয় না দাদা। 
- সে তো বুঝেছি। 
এভাবে নানা কথার মাঝে জিজ্ঞেস করেই ফেললাম, বিয়ে করেছ? 
- না দাদা, করিনি, তবে দেখাশোনা চলছে। 
আরও নানা কথা বলে একরাশ ভাল লাগা নিয়ে বাড়ি ফিরে আসি। 

তবে মেয়েটির কথা তুলিনি, আর জানতেও চাইনি কিছু। যদি অন্য কোনও দিন মেয়েটির কথা জানতে পারি, সেদিন পঞ্চম দৃশ্যটি লিখে ফেলব।