Thursday, February 13, 2020

ধ্বংসের ছন্দ

।। ধ্বংসের ছন্দ।।

জীবন, ছন্দহীন, 
শব্দেরা মুঠোয় ধরা পাখি 
উড়তে মানা নেই
তবু যত্নে ধরে রাখি।

অতিক্রান্ত কাল
মুহূর্তের শব্দের মত
সময়ের নিস্তব্ধতা 
আগলে রাখা স্বপ্ন যত।

আশারা হোঁচট খায়
স্পৃহা যত পদপিষ্ট, 
কাব্যেরা বন্ধ দ্বারে
ধ্বংসাবশেষ অবশিষ্ট। 

জীবনযুদ্ধ থামতে চায়
এলোমেলো নয় শব্দ যত,
ছন্নছাড়া আলোর নেশায়
লাগামহীন ধ্বংসের ক্ষত।

বনগাঁ,  ২২.৫.২০১৯

সত্য - মিথ্যে

।।  সত্য - মিথ্যে  ।। 

তোমার স্নিগ্ধ মিথ্যে আমি উপহার চাই না,
তিক্ত সত্য দিও, বুকে আগলে রাখব
তোমার মিথ্যে মায়ার চোখে আমাকে দেখোনা
নির্মম রুক্ষ রক্তচক্ষু দিও, চোখে হারাব।

এ বুকের ঝড়ে মাথা রাখো, সে আমি চাইনা
খড়কুটো ধরে বাঁচার চেষ্টা,  ভুলেছি কত আগে
তুমি জোৎস্না হয়ে ফিরে আসো, সে আর চাইনা
নিকষ কালো হয়ে আসো, সে আশাই জাগে।

ইচ্ছে ডানায় ভর করে তেপান্তরের পাড়ে 
তোমাকে সাথে নিয়ে আর হারাতে চাইনা,
আকাশ চিরে রক্তস্নান, উত্তাল নদীর ধারে
ফেলে আসা গোধূলির টুকরো, ফেরৎ চাইনা।

মিথ্যে টাকেই সত্যি বলে, ডাকব আর একবার,
যদি কাছে আসতে চাও, এসো কাছে, বাধা নেই
বৃষ্টি গুড়ো মাথায় নিয়ে ভিজব না হয় আবার
ঠিকানা চাও, বলে দিচ্ছি, আমি কোথাও নেই।

২৮.৫.২০১৯, ব্যারাকপুর।

বিষ রোপণ

।।   বিষ-রোপণ  ।। 

যে বিষ তুমি দিলে আজ আমার বুকে
গ্রহন করেছি, ধারণ করেছি নিঃশর্তে
তোমার শত অনুযোগ, হয়ত যাবে চুকে
জীবনের সব হিসেব-নিকেষ, এক মুহূর্তে। 

না বলা কথায়, দৃষ্টি যখন বাধা পায়
জমাট শূণ্যতা, আর সীমাহীন আকাশের মাঝে
নীরবতার ভাষাও যখন বাকশক্তি হারায়,
আমার নানা রঙের আকাশ অন্ধকারে সাজে।

তোমার দেওয়া গরল উপহার, আকন্ঠ আমার
শিরায় শিরায় তারই স্রোত বয়ে চলে অবিরাম
নিঃশব্দে ক্ষয়ে যায়, রুদ্ধ হয় সম্পর্কের দ্বার,
খুঁজে চলি ভালোবাসা, হারানো স্পর্শের দাম।

মৌনতা আমার চতুর্দিকে, হিমালয়ের মত 
শীতলতা, কঠোরতা আমাকে রেখেছে ঘিরে,
সাজিয়ে দিয়েছ  জীবন, নিজের মনের মত
ভুলে যেওনা,সত্যি বিষ, তুমি পাবে ফিরে।

হারবে তুমি, জিতব আমি, তা বলছি না
বৃথা কথার আড়ালে, আর করব না তর্ক,
কথার ভাঁজে অট্টালিকা,  চাইতে পারিনা, 
তুমি আমি জিতব সবাই, হারবে সম্পর্ক। 

২৯.৫.২০১৮
হবিবপুর, নদীয়া।

বাবা....

অনেক দিন পর, হ্যাঁ অনেক দিন পর,
আবার সেই চেনা গন্ধ পেলাম, তোমার পাশে শুয়ে,
কত পরিচিত, কত না আপন সে গন্ধ,
সারাদিনের কাজের শেষের, ক্লান্ত অবসন্ন দেহের
ভেজা ঘামের গন্ধ, আমার খুব আপন, 
কত বার খুঁজি, কত বার হাতরাই, অজান্তেই,
বারে বারে ছুঁতে চাই, সেই ভেজা শরীর। 

মিথ্যে বলা মানুষটা, খুব আপন আমার, 
জানি, কোন জাদুদন্ড নেই তোমার হাতে, তবু
জাদুকর তুমি আমার কাছে, চাহিদা পূরনের কারিগর,
অনেক অভিযোগ আছে আমার, তোমার কাছে,
কেন এত মিথ্যে বল?
কেন বল, আমি কখনও ক্লান্ত হই না, 
কেন বল, আমি সবসময় ভাল থাকি,
কেন বল, আমার কোন অভাব নেই,
কেন বল, আমি কখনও কাঁদি না, 
কেন বল, আমি একলা ঘরেও ভাল আছি, 
কেন? কেন? কেন? 

তুমি যখন ঘুমিয়ে ছিলে, আমি তোমার পাশেই ছিলাম,
ঘুম আসছিল না, তোমাকে দেখছিলাম,
আমার কত দিনের পুরোন অভ্যাস, 
তোমাকে জড়িয়ে ঘুমানোর, 
আজ জড়িয়ে ধরতে পারলাম না, 
তোমার মাথায় হাত রাখলাম, আসতে করে, যাতে জেগে না যাও,
ওভাবেই থাকলাম কিছুক্ষণ,  শান্তি, কী শান্তি।  

তুমি উঠে যাওয়ার পর, তোমার বালিশে মুখ রেখে শুলাম,
বুক ভরে ঘ্রাণ নেব,  তাই, 
তোমার স্পর্শ মাখা ঘ্রান, 
বড্ড প্রিয় আমার।

হ্যাঁ,  বাবা বড্ড ভালবাসি তোমায়, 
তোমার মিথ্যে গুলোকেও খুব ভালবাসি, 
সবাইকে ভাল রাখতে তোমার নিজের ভাল থাকার অভিনয়, 
সেটাও খুব ভালবাসি। 
ভাল থেকো বাবা আমার।

রবীন্দ্র, ১৭.৬.১৮

এভাবেও জীবন চলে

# জীবন 
হ্যাঁ, এভাবেও জীবন চলে, না চলে না, চালাতে হয়, বাধ্য হয়ে চালাতে হয়। ট্রেনে দেখা পেলাম, অফিস যাওয়ার পথে, রানাঘাট - বনগাঁ লোকাল। স্বামী - স্ত্রী,  একসাথে, হাতে হাত ধরে লোকাল ট্রেনে বাদামের খাঁজা বিক্রি করছে। শক্ত মুঠোয় হাত ধরা, স্বামীকে যেন কিছুতেই হাতছাড়া করতে চায় না এই দুর্বল শরীরের, কঠিন মানসিকতার মহিলা। আর হাত ছাড়বেই বা কিভাবে, তার স্বামী অন্ধ, হাতে ঝোলানো ব্যাগ ভর্তি বাদামের খাঁজা, মুখে দুর্বল কন্ঠে আহবান,  বাদামের খাঁজা নেবেন, বাদামের খাঁজা, পাঁচ টাকা পিস। না, এই ডাক অস্বীকার করার ক্ষমতা আমার ছিল না, আমার মত আরো অনেকেই এক মৃদু ডাক অস্বীকার করতে  পারেনি। অনেকেই দশ টাকার নোট বাড়িয়ে বলেছে আমাকে দুটো দিন। না, তারা কেউই ট্রেনে বসে বাদাম খায়নি, ব্যাগে রেখে দিয়েছে, হয়ত পরে খাবে। 

প্রতিবার টাকা হাতে নেওয়ার পর ওই স্ত্রী টাকাটি মাথায় ঠেকিয়ে স্বামীর হাতে দিচ্ছিলেন, স্বামীও সেটি মাথায় ঠেকিয়ে ব্যাগে রাখছিলেন। এভাবেই তারা হয়ত তাদের প্রতিটি ক্রেতাকে প্রনাম করছিলেন, ধন্যবাদ দিচ্ছিলেন। 

পরের স্টেশন আসতেই তারা কামরা বদল করলেন। আবার সেই শক্ত মুঠি, স্বামীকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়া। এ যেন পথ শেষ না হওয়া পথের গল্প। 

না, কোনও ছবি তুলে রাখিনি, দ্বিতীয় বার দেখলেই চিনতে পারব, এ পথে আমার আসা যাওয়া আছেই। যখন আবার দেখব, তাদের যেন হাসি মুখে দেখতে পাই। 

ভাল থাকুক, নাম না জানা ভাই বোনেরা। এ শুধুই প্রার্থনা,  আমরা সবাই জানি, এ জীবন কেমন জীবন। তবু আশা রাখি, এভাবেই ভালোবাসা বেঁচে থাকুক, দাম্পত্য বেঁচে থাকুক, বিশ্বাস বেঁচে থাকুক, নির্ভরতা বেঁচে থাকুক,  সংগ্রাম বেঁচে থাকুক,  সুখ, ভালোলাগা বেঁচে থাকুক  আর সর্বোপরি জীবন বেঁচে থাকুক।

৬ টি বছর পার হল...

৬ টি বছর পার হল...

হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছ, আমাদের বিয়ের ছ'টি বছর পার হল, আজ ১৮ ই নভেম্বর,  ২০১৯। সেই কবে, ২০১৩ সালে,  আজকের দিনে আমাদের বিয়ে হয়েছিল, প্রথম দেখার প্রায় ৭ মাস পরে। আর এই দেখা আর বিয়ের মাঝের ৭ মাস, সে খুব সুখের সময় হওয়ার কথা ছিল, আমার ক্ষেত্রে হয়নি, পারিবারিক কারনে, চেনা মানুষের অচেনা আচরন, আমার সিদ্ধান্তকে সমর্থন না করা, পাশ থেকে সকলের সরে যাওয়া, বাড়ি ছেড়ে ভাড়া বাড়ি যাওয়া, একাকী জীবনযাপন, নিঃসঙ্গতা,  জীবনটিকে খুব এলোমেলো করে দিয়েছিল। আজ যখন আবার পিছনে তাকাই, খুব অবাক হই, হিসেব মেলে না, মেলাতে পারি না, আর জীবন কবেই বা আর হিসেব মেনে চলে। 

তবুও সব কিছুর মাঝে এক টুকরো আলো, খোলা হাওয়া, মন ভাল করা কথা, ভরসা দেওয়া একটি মন সর্বদা পাশে ছিল, সেই মেয়েটি। যাকে ভালোবেসেছিলাম। তখনও বিয়ে হয়নি আমাদের, কিন্তু তখন থেকেই ও আমার সর্বক্ষণের সাথী,  আমার বন্ধু, আমার ভরসা। প্রায় ৬৫ কিমি দূরে থাকলেও ও সর্বদাই আমার কাছাকাছি থাকত, এক সেকেন্ডের জন্যও ওর সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হত না। 

তখন Android আমার ছিল না। কিন্তু এসএমএস আর কল প্রায় ১৮ ঘন্টা চলত। প্রথম হেডফোনের ব্যবহার সেই সময় শুরু করি, প্রথম এসএমএস প্যাক তখন নেওয়া শুরু করি আর প্রথম ভোডা টু ভোডা unlimited pack আর পরে Docomo to Docomo unlimited pack ব্যবহার শুরু করি। সে এক দারুন সময়। তখন তো আর জিও আসেনি বা Airtel ও  আজকের মত  Unlimited হয়ে যায়নি। ২৩৫ টাকায় unlimited কল ২৮ দিন। তাতেই চলত সারা দিন কথা আর অফিসে লোকজন আর কাজের মাঝে চলত SMS. 

অফিসে তো কয়েকজন বলতেই শুরু করে দিল, রবিনকে তো আগে কখনো ফোন ঘাঁটতে দেখতাম না, কী হল রবীনের, সারাক্ষণ ফোন ঘাঁটছে।  আর তখন আমার ছিল নোকিয়ার আশা 510 বা এই ধরনের কিছু একটা। মেয়েটির সাথে এক মুহূর্তের জন্য যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হতে পারতাম না। ভালোবাসতাম যে!! আর এখন কী ভালবাসিনা?  বলছি সে কথা। 

এই ছটি বছরে আমরা নানা ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে গেছি, আজও যাই, হয়ত কম বেশি সকলেই যায়, যেতে হয়, তবুও ভালবাসা আজও প্রানবন্ত,  চেষ্টা করি বুঝতে, মনের অনুভূতি গুলোকে অনুধাবন করার চেষ্টা করি, তবু জানা সম্পূর্ণ হয়ে ওঠে না। হয়ত এভাবেই আমরা একে অন্যকে জানার চেষ্টা করতে করতেই অনেক বছর কাটিয়ে ফেলব। আর ভুল বোঝাবুঝি,  সে তো বোঝার চেষ্টা করার অংশ।  

আজ যখন সেই মেয়েটির কথা ভাবি, তখন মনে হয়, ওকে আরও কিছুটা যত্নে রাখা প্রয়োজন,  আর একটু সময় দেওয়া, আরও একটু যত্ন নিয়ে কথা বলা, ওর কথার প্রতি মনোযোগী হওয়া দরকার ছিল। সেই যত্নে থাকা মেয়েটি আজ কিছুটা  যেন অবহেলিত,  সংসারের নানা কাজের চাপে আর বাচ্চা সামলাতে সামলাতে মেয়েটি আর নিজের খেয়াল রাখতেই পারে না। তাই বলে ওর স্বামীর যত্নে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য নেই। নিজের শরীরের খেয়াল না রাখলেও ও আমার খুব খেয়াল রাখে, আমি বুঝি, কিন্তু প্রকাশ করি না। সেই বিয়ে হওয়ার আগের খেয়াল রাখা আর আজকের মধ্যে আমি তফাৎ দেখি না। 

আর আজকের দিনটি আমি আলাদা করে কিছুই করিনি। সত্যি বলতে কি, ১৮ তারিখ মাথায় ছিল, কিন্তু আজ যখন ঘুম থেকে উঠি, আজকের তারিখ টাই মনে ছিল না। মেয়েটি সেই কোন ভোরে উঠে সব কাজ সেরে আমাদের মেয়েকে গুছিয়ে রাখে, আর আমি বেলায় ঘুম থেকে যখন উঠলাম, মেয়েটি বলল, আজ অফিস না গেলে হয়না? আমি বললাম, সে কি করে হবে, অফিসে অনেক কাজ রয়েছে, আর আজ সোমবার, আমি কথা দিয়ে এসেছি, সোমবার আসব, তাই না গেলে হবেনা। 

মেয়েটি বলল, আগে তো এক আধ দিন অফিসে যেতে না করলে শুনতে, আর এখন অফিসে যাওয়ার এত ধুম পরে গেল যে! তুমি যে বলো, অফিসে আর কোনও কাজ নেই! আমি হেসে ফেলি আর বলি, না, আমার কাজ আছে। যাই, যেতে হবে। মেয়েটি কিছু না বলে আমার স্নানের জল,  টিফিন ইত্যাদি গোছাতে চলে গেল। 

আমিও যথারীতি অফিসে চলে এলাম। অফিসে এসে ফেসবুক খুলতেই Memory চলে এল। ব্যাস। মনটা একটু হলেও খারাপ হয়ে গেল। গত ৫ বছর প্রতিবার বাড়িতেই ছিলাম একসাথে। এবার আর হল না। আবার,  এমনিই, আজ সোমবার, আমি ব্যারাকপুর অফিস করি, নৈহাটি থাকি, কাল আবার ব্যারাকপুর,  তাই আর হবিবপুর ফিরিনা, লম্বা পথের অনেকটা দাঁড়িয়ে যাতায়াত করতে পারিনা, আর চাইও না। 

তাই ওকে আজ একটু যেন বেশি মিস করছি, সাথে আমদের ছোট্ট ছানা আছে একটা, ওকেও। 

যাইহোক, অনেক কথা লিখলাম। কিন্তু ফেসবুকে কেন? ফেসবুক তো আমার বৃহত্তর পরিবার, আমার সব কাছের মানুষ তো ফেসবুকেই আছে, তাই সবার সাথে ভাগ করে নেওয়া। 

আর এতক্ষণ যে মেয়েটির কথা বললাম, সে সেই মেয়েটি, যাকে ছবিতে দেখে ভালবেসেছিলাম, আর বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। সেই প্রথম ছবিটি যদি পাই, শেয়ার করব।।

পেয়েছি, সেই প্রথম দিনের ছবি, আমাদের বিয়ের আগের। 

আর তোমাকে ভাল থেকো বলার কোনও অর্থ হয়না, বরং বলা ভাল, ভাল রাখব। তুমি তো সবাইকেই ভাল রাখার চেষ্টা কর।

পুরুষ তুমি এভাবে ছোঁবে

পুরুষ তুমি ছুঁতে চাইলে এমনিভাবে ছোঁবে।।

এই যে বাসে ট্রেনে, রাস্তাঘাটে, ভীড়ের ঠ্যালাঠেলিতে তুমি আমায় ছুঁয়ে দাও, তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই। এমন তো কতবার হয়েছে। কতজনে কতভাবে তাকিয়েছে, ছুঁয়েছে। একবার জানো কি হল? তখন বয়সটা বেশ অল্প। কলকাতায় লোকাল ট্রেনে চেপেছি। একটাই মাত্র স্টেশন মাঝে, কিন্তু একেবারে চাপাচাপি ভীড়। কোনরকমে ট্রেনে পা রাখতেই ট্রেন ছেড়ে দিল। আমি ঝুলছি ট্রেনের বাইরে। কোনরকমে একটা লোহার রড ধরে আছি, কিন্তু ঘাম ঘাম হাতে তাও পিছলে যাচ্ছে। হঠাৎ একটা পুরুষালি হাত কনুইয়ের কাছটা ধরেই হ্যাঁচকা টানে ট্রেনের ভেতরের দিকে নিয়ে এল আমাকে। আমি বললাম, "প্লিজ ছাড়বেন না। আমি পড়ে যাব তাহলে।" 
"ছাড়ছি না। ভয় নেই।" ভয় ছিল না আর।
আরেকবার। সেবার গায়ে জ্বর। মাথায় কি ঘুরছিল, চট করে হোস্টেল থেকে বাড়ি যেতে খুব ইচ্ছে হল। ট্রেন নেই, কোন ভাল বাস নেই। ঝরঝরে একটা বাস যা পেলাম উঠে পড়লাম। তিলার্ধ জায়গা নেই বাসে। আমি গায়ে জ্বর নিয়ে ধুঁকছি দরজার কাছটায়। পিঠের ওপর হাত পড়ল। একজন গ্রাম্য বৃদ্ধ। বললেন, "বসবে মা? আমি দাঁড়াতে পারব না। এই পাশটায় বস কষ্ট করে।" পাশে জায়গা ছিলনা তেমন। আমার মাথা তোলারও ক্ষমতা ছিল না। রীতিমত ওনার পায়ের ওপরে বসে পড়লাম। জানলার হাওয়া চোখেমুখে লাগল। আঃ শান্তি!
এরকম হয় কিন্তু। রাস্তাঘাটে কেউ কেউ হাঁ করে তাকিয়ে দেখে। অস্বস্তি হয়। আমারও হয়। কিন্তু কখনো কখনো খুব ভাল লাগে। একবার যেমন। কোথাও যাচ্ছিলাম, বই পড়তে পড়তে বাসের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছি। শেষ স্টপেজে এসে কন্ডাক্টর ডেকে তুলল। চেয়ে দেখলাম একটা গন্ডগ্রাম। আর একটি ছেলে আমার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। আমি পাত্তা না দিয়ে বাস থেকে নেমে পড়লাম। বিকেল হয়ে এসেছিল। কন্ডাক্টর বলল এরপর বাস আবার দু'ঘন্টা পর। একা একা দাঁড়িয়ে আছি। ভাবছি কি করব। দেখি পেছনে ঐ ছেলেটিও এসেছে। 
"এখানে একটা দোকানে আমার বাইক রাখা থাকে। আমি পৌঁছে দেব?"
"না না। কি দরকার।"
"ভয় নেই। বাড়ি অব্দি পৌঁছে দেব। পরের বাস আসতে আসতে রাত।"
কি মনে হল! বললাম "চলুন।" 
"ভাল করলে ধরে বসুন তো। চাপ নেই।" বসলাম।
আমাকে ঠিকানা জিজ্ঞেস করে একদম বাড়ির দরজা অব্দি পৌঁছে দিয়ে গেল। আবার মাকে বলেও দিল, "বলুন কাকিমা, বাসে ওভাবে কেউ ঘুমিয়ে পড়ে?"

এই তাকিয়ে থাকাগুলোও বেশ লাগে তো। তারপর কেউ যদি এমনি এমনি আদর করে, ধর অচেনা কেউ, আমার তাও  ভাল লাগে।
তখন সন্তানসম্ভবা আমি। দূর্গাপুজোয় লাইনে দাঁড়িয়ে অষ্টমীর প্রসাদ নিচ্ছি। খুব গরম। হাঁসফাঁস করছি। এক চল্লিশোর্ধ এগিয়ে এলেন। একটা প্লাস্টিকের চেয়ারে আমায় বসিয়ে ভোগ নিতে গেলেন। একটু পরে এসে ভোগের খিচুড়ি, পায়েসের প্লেট আমার হাতে দিলেন। যাবার সময় গালে আলতো ছুঁয়ে বললেন, "এই অবস্থায় অত রোদে কেন দাঁড়ালে? মুখটা দেখ, মা দূর্গা যেন।"
তারও অনেকদিন আগে, বেশ পাঁচ-ছ'বছর আগের ঘটনা। জীবনে প্রথমবার রেডিওথেরাপি নিচ্ছিলাম, এই দিনদশেকের। তখন জানতামই না এর কি মাহাত্ম্য। ব্যাঙ্গালোরে থাকি। বিদেশ বিভূঁয়ে বদনাম করার লোক পাওয়া যায়, পাশে থাকার লোক কম।
প্রথম দুদিন বেশ নাচতে নাচতে থেরাপি নিলেও তৃতীয় দিনে এসে অবস্থা কাহিল। এরকমই একদিন থেরাপির জন্য অপেক্ষা করছি, অফিসের এক কলিগের ফোন এল। খুব কাছের নয়, মোটামুটি বন্ধু। জিজ্ঞেস করল কোথায় আছি। বললাম থেরাপি নিচ্ছি। আঁতকে উঠে বলল, "রেডিওথেরাপি চলছে, বলনি একবার?"
হসপিটালের নাম জিজ্ঞেস করল। সেদিন থেরাপি সেরে বাইরে এসে দেখি রিসেপশনে দাঁড়িয়ে আছে। 
মাথায় একটা চাঁটি মেরে বলল, "আইডিয়া আছে কোনো কি হচ্ছে? এবার থেকে আমি আসব সাথে, খবরদার আসবে না একা।" সেদিন চোখের জলটা আর দেখতে দিই নি।

ছুঁতে হলে এমনি করে ছোঁও। এমন করে, যাতে শেষ দিন অব্দি তোমার ছোঁয়াটুকু মনে করে রাখতে পারি। গর্ব করে, আনন্দ করে বলতে পারি তুমি একটু হলেও অনেকখানি  ছুঁয়েছিলে আমাকে। এখনও ছুঁয়ে আছো। প্রত্যেকবার এমনি করে ছুঁও। সত্যি বলছি, আমার ভাল লাগে। আমি কিচ্ছু মনে করি না।

(সংগৃহীত)
 লেখাটা post করার পর comment থেকে জানতে পারলাম লেখিকার নাম নুপুর চক্রবর্তী।ধন্যবাদ জানাই ওনাকে।