Sunday, November 22, 2020

সবটা গল্প নয় ( ষষ্ঠ দৃশ্য) ==================

সবটা গল্প নয় ( ষষ্ঠ দৃশ্য) 
==================

পঞ্চম দৃশ্য পর্যন্ত ঘটে যাওয়া বিষয় গুলো এমন - অর্নব বিশ্বাস লেখাপড়া করে বিডিও হয়েছে, এখনও অবিবাহিত আর তার ভালোবাসার মানুষ তিতলি ওরফে অনিন্দিতা রায় বিয়ে করেছে সায়ন্তন বসু নামের একজন ডাক্তারকে। 
পড়াশোনায় খুব নিষ্ঠা থাকা ও জীবনে সফল হওয়ার চেষ্টায় থাকা মেয়ে তিতলি বিয়ের পরে সুরক্ষায় রিসেপশনিস্ট হিসেবে কাজ করছে। তার সফল হওয়ার স্বপ্ন, স্বপ্নই থেকে গেছে। অপরদিকে, যার সফল হওয়ার কথাই ছিল না, সেই অর্নব, তিতলিকে হারিয়ে ভীষন ভাবে পরিবর্তিত হয়ে যায়, আর কঠোর পরিশ্রম ও সাধনার জোরে সে আজ সফল বিডিও। 

তাহলে কী তিতলি তার বাকি জীবন এক সাধারণ গৃহবধূ হয়েই থাকবে? রিসেপশনিস্ট এর কাজই কী তার গন্তব্য ছিল? সে যে খুব উচ্চাকাঙ্খী মেয়ে, আমি যে তার চোখে অন্য কিছু দেখে এসেছি। 

আমি অর্নব আর তিতলির কথা ভুলেই গেছিলাম। নিজের অফিসের কাজকর্ম আর লেখাপড়া,  গানবাজনা করেই সময় কেটে যাচ্ছিল। ওরা আমার মন থেকে মুছেই গিয়েছিল। 

কিন্তু কথা দিয়েছিলাম, যদি কোনও দিন তিতলির সাফল্যের গল্প জানতে পারি সেদিন এই গল্পের ষষ্ঠ দৃশ্য লিখে ফেলব। 

ষষ্ঠ দৃশ্য 
===============
===============

ঘটনার সূত্রপাত এভাবে। আমার বরাবর ইউটিউব দেখার অভ্যাস, বিশেষ করে Motivational Video, Success Story খুব দেখি। আর UPSC Topper দের Mock Interview,  তাদের Journey, Successful candidates দের interview এসব দেখা আমার প্রায় প্রতিদিনকার সাধারণ কাজে পরিনত হয়েছে। এভাবেই একদিন ভিডিও দেখতে দেখতে একটি Success Story সামনে আসে। 

কার স্টোরি, কিচ্ছু জানি না। অভ্যাসবশত দেখছি।  তো, সেই ভিডিওটি ছিল Dristi IAS Centre এর সফল candidate দের নিয়ে। অনুষ্ঠানের শুরুতে সঞ্চালক বলছেন - 

- প্রতিবছর আমাদের একাডেমি থেকে বেশ কিছু ছাত্র ছাত্রী সফল হন। তারা সকলেই যে মেধাবী, তা নয়, কিন্তু পরিশ্রমী ও নিষ্ঠাবান, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। তারা সফল হওয়ার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন, আর নিজের একশ ভাগ উজার করে দিয়েছেন, তাই তারা সফল।   অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু আজ আমি তোমাদের সামনে এমন একজনকে নিয়ে আসতে চলেছি, যে একই সাথে মেধাবী,  পরিশ্রমী, দৃঢ় প্রতিজ্ঞ,  যার নিষ্ঠায় কোনও ত্রুটি নেই, যে তার ব্যক্তিগত জীবনের সব বাধা দূরে সরিয়ে আজ সফল, শুধু সফল নয়, তার All India Ranking 4. 

আমার দেখার আগ্রহ বেড়ে গেল। 
সঞ্চালক বলে গেলেন - 
- যিনি তার সাত মাসের প্রেগন্যান্সি নিয়ে মেন পরীক্ষা দিয়েছেন, আর একমাসের সন্তানকে নিয়ে Interview দিয়েছেন। 

আমি অবাক হয়ে গেলাম। এমন স্টোরি তো শুনিনি। আমার আগ্রহ বেড়ে গেল। সেই মেয়েকে দেখার জন্য একবার ভিডিওটি skip করতে ইচ্ছে হল, কিন্তু কথাগুলো শোনার জন্য অপেক্ষা করলাম। 

তিনি বলে চললেন - 
- তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন,  ইচ্ছেশক্তির থেকে বড় কোনও শক্তি নেই। আমারা একাডেমির সকল সদস্য তাকে কুর্নিশ জানাই। প্লিজ, মঞ্চে আসবেন  মিস অনিন্দিতা রায়।  

আমার একটু খটকা লাগল, বলছে সন্তান নিয়ে পরীক্ষা দিল, আবার বলছে মিস।  যাইহোক, আমি শুনতে থাকলাম। 

আগেই বলেছি, আমি তিতলির কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। নামটি শোনার পরেই বড় বড় চোখে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকি। এভাবে ওকে খুঁজে পাব, স্বপ্নেও ভাবিনি। আমার গল্পের নায়িকা যে এভাবে সাফল্য হাসিল করবে, এ আমার কল্পনার অতীত। ওর জয় যেন আমারই জয়। মুহূর্তে ছ বছর আগের সেই ট্রেনে পড়তে দেখা মেয়েটির মুখ, তার চালচলন,  তার লুকিয়ে রাখা প্রেম, কাঠিন্য সব ভেসে উঠলো।  তাহলে কিছুই বৃথা যায়নি, কিছুই বৃথা যায় না আসলে? মনে হচ্ছিল যেন আমারই পরিবারের কেউ যুদ্ধে জয়ী হল। 

আবার সন্দেহ হল, এ কি আমার গল্পের তিতলি না অন্য কেউ!  
মঞ্চে যে এল, তার পরনে হাল্কা নীল শাড়ি, পিঠে ছোট খোলা চুল, চোখে রিমলেস চশমা,  বাঁ হাতে ব্রাউন বেল্টের ঘড়ি, ডান হাতে একটি বালা, গলায় সরু চেন, কানে ছোট দুল। মুখে প্রশান্তি।  ধীর অথচ দৃঢ় পায়ে মঞ্চের মাঝে দাঁড়ালো। সঞ্চালক মাইক এগিয়ে দিলেন। 

হ্যাঁ, এ সেই আমার গল্পের তিতলি।  আমাদের গ্রামের তিতলি। 

ও যা বক্তব্য রাখল, সবটাই ইংরেজিতে,বাংলা করলে এমন দাঁড়ায় - 

- আমার একাডেমির সকল স্যার, ম্যাডামকে আমার প্রনাম, ভালবাসা জানাই, তারা পাশে না থাকলে এই সাফল্য কখনোই পাওয়া সম্ভব হত না। আমি জানি,  আমার জার্নি একটু আলাদা ছিল। তার জন্য আমি আমার পরিবারের সদস্য মানে আমার মা, বাবা, ছোট বোন ও ভাইকে আলাদা করে ধন্যবাদ দেব, ওরা পাশে না দাঁড়ালে আজ তোমাদের সামনে কথা বলার সুযোগ হত না। তবে আমি আমার লড়াই নিয়ে কিছুই বলতে চাই না। আসলে আমাদের সবাইকেই লড়তে হয়,  শুধু লড়াইয়ের ধরন ভিন্ন ভিন্ন। শুধু এটুকুই বলব, কখনো মনে করবে না, আমিই সবথেকে বড় প্রব্লেমের মধ্যে আছি, সেটা তোমাকে শুধুই পিছন দিকে নিয়ে যাবে। যে অবস্থাতেই থাকো না কেন, লক্ষ্যে পৌঁছাতে যা যা করা দরকার, সেই কাজটি নিরবচ্ছিন্ন ভাবে করে যেতে হবে। বাকী সব কিছুকে পাশ কাটাতে হবে। সব মানে,  স....ব। সাফল্য তবেই আসবে। 

আমার মনে আবার প্রশ্ন, স্বামীর কথা তো কিছু বলছে না। তবে কী..... ,  দেখি পরে কী বলে!  

আবার বলছে -
ব্যক্তিগত জীবনে সমস্যা আসতেই পারে, সেগুলো পাশ কাটিয়ে চলা অভ্যাস করে ফেলতে হবে। তুমি তোমার শরীরে তোমার সমস্যা বহন করে বেড়াতে পারবে না। কেউ তার মূল্য দেবে না। সিমপ্যাথি পেয়ে বড় কিছু করা যায় না, সেটা আশাও করবে না। বিশ্বাস রাখো নিজের উপর, পরিশ্রমের উপর, সততার উপর। নিরলস ভাবে, সঠিক পথে পরিশ্রম করার মানসিকতা গড়ে তোল। আমাদের স্যারেরা রয়েছেন তোমাদের জন্য। আমি বড় কিছু করে ফেলিনি, অবিশ্বাস্য কিছু করে ফেলিনি, আমি জিনিয়াস নই, আমি আলাদা কোনও প্রানী নই। আজ আমি যেটা পেরেছি, কাল তোমরাও সেটা পারবে। আগামী দিনে তোমরাও অন্যদের মোটিভেট করবে, স্টেজে বক্তব্য রাখবে। আমি তোমাদের থেকে একটি কথা নিয়ে যেতে চাই, আমাকে কথা দাও, তোমরা সবাই UPSC Clear করবে। 

সমবেত সবাই চিৎকার করব জানায় - 
ইয়েস,  ম্যাম। উই প্রমিস ইউ। 
-  Thank you.  

এই বলে স্টেজ ছেড়ে দেয়। অনুষ্ঠান চলতে থাকে। আমার আর দেখার ইচ্ছে হয় না। আমি আবার সার্চ করতে শুরু করি, অনিন্দিতা রায়ের অন্যান্য interview পাওয়া যায় কিনা।।যাতে জানতে পারি, তার বর্তমান সামাজিক অবস্থান, পারিবারিক অবস্থান, এমমকি তার পোস্টিং কোথায় হল। আমাকে জানতেই হবে। গল্পের প্রয়োজনেই আমাকে জানতে হবে। 

আপাতত জানতে পারলাম তিতলি UPSC Clear করেছে, কোন পোস্টে আছে আর কোথায় পোস্টিং, আর ওর রিসেপশনিস্ট থেকে IAS হওয়ার জার্নি জানতে পারলে এই গল্পের সপ্তম দৃশ্যটি লিখে ফেলব। এবার অনির্বান কেও আর একবার খুঁজে বের করতে হবে। 

শুভরাত্রি।