কথোপকথন – ২
....................................
আজ সকালে এক আত্মীয়াকে ট্রেনে তুলে দেওয়ার বিষয় ছিল, সে যাবে জিয়াগাঞ্জ আর আমি যাব ব্যারাকপুর। ঠিক করেছিলাম অফিস যাওয়ার পথে একই ট্রেনে যাব, সে কালীনারায়নপুরে নেমে যাবে আর আমি সোজা চলে যাব ব্যারাকপুর, কিন্তু বাধ সাধল আমার তিন বছরের মেয়ে। সে বলে বসল,
- বাবা, আমিও তোমার সাথে যাব।
কান্নাকাটির ঝামেলা না করার জন্য আমি বললাম ঠিক আছে, তাই হবে, তুমিও যাবে। যথারীতি আমরা তিনজন বাইকে যাত্রা করলাম। বুঝে গেলাম আজ আর সঠিক সময়ে অফিস যাওয়া হচ্ছে না, চারদিন পরে অফিস খুলল, তাও আবার লেট। যাইহোক, সেই আত্মীয়াকে ট্রেনে তুলে দিয়ে দিলাম।
গল্পটি এবার শুরু। প্লাটফর্ম দিয়ে হাঁটছিলাম, আমি আর মেয়ে, একটি ট্রেনের টিকিট পড়ে ছিল। লোকের পায়ে পায়ে নোংরা হয়েছে। মেয়ে বলল,
- বাবা, এটা কী পড়ে আছে?
- টিকিট পড়ে আছে মা।
- কারা ফেলেছে বাবা?
- লোকেরা ।
- কোন লোকেরা বাবা?
- ঐ যারা ট্রেনে করে এখান থেকে কোথাও যায়, বা অন্য কোথাও থেকে ট্রেনে করে এখানে এসেছে, তারা।
এবার একটু অন্যরকম প্রশ্ন,
- লোকেরা টিকিট ভালোবাসে না, বাবা ?
খুব স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর দিলাম,
- হ্যাঁ, মা, বাসে তো, বাসবে না কেন?
- তাহলে ফেলে দিয়েছে কেন?
- আর দরকার নেই বলে।
এবার আমার অবাক হওয়ার পালা।
- দরকার না থাকলে কি ভালোবাসতে হয় না, বাবা ?
একটু চুপ থাকলাম, বললাম,
- হ্যাঁ, মা, দরকার না থাকলেও ভালবাসা যায়, ভালবাসতে হয়।
ছোট্ট মানুষের সহজ প্রশ্ন,
- তাহলে লোকেরা ওগুলো ফেলে দিল কেন?
- ওগুলোর আর প্রয়োজন নেই মা, ওদের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে।
- প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে ভালোবাসতে হয় না?
- হ্যাঁ, মা, প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলেও ভালোবাসতে হয়। যত্ন করতে হয়।
ছোট্ট মানুষটি কী বুঝলো, কে জানে, সে বলল,
- ও, তাই?
- হ্যাঁ, তাই, মা আমার।
আমরা প্লাটফর্ম পার করে গ্যরেজে চলে এসেছি। বাইকে মেয়েকে বসিয়ে বললাম, তুমি কিছু খাবে মা,
- না, বাবা, বাড়ি চল, আমি তোমার সাথে স্নান করব।
বাইক ছুটছে, মেয়ে আয়নায় মুখ দেখছে, আমার মাথায় প্রশ্ন ঘুরছে, আমরা কি সত্যিই প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলেও ভালোবাসতে পারি? দরকার মিটে গেলেও ভালোবাসতে পারি? নিজেকেই প্রশ্ন করলাম। না, আমিও পারি না, পারি নি,আমার তরফ থেকেও অনেক অবহেলা আছে, যত্নের অভাব আছে, কিছুটা নিজের জগত তৈরি করে সেটাতেই নিজেকে আবদ্ধ রেখে ভাল থাকার চেষ্টা আছে। আমার কাছে এগুলো ভুল বলে মনে হলেও এই অভ্যাস থেকে বেরোতে পারি না। ভয় হয়, না জানি সম্পর্ককে যত্ন নিতে গিয়ে বিপরীত দিকে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি ভেবে না বসে, আবার বুঝি কোনও দরকারে এসেছে। তার চেয়ে এই বেশ ভাল আছি। ভালোবাসাটি মনেই থাকুক সসম্মানে।
আচ্ছা, আমাদের জীবনে কী সবটা কি দরকার আর প্রয়োজন ভিত্তিক? না , নিশ্চয়ই। ছোটবেলায় পিসি বাড়ি, মাসি বাড়ি, কাকা বাড়ি যেতাম,সকলেই গেছে, নেহাত ঘুরতে, আনন্দ করতে, কোনও দরকার ছিল না, ভালোবাসা আর আদরের বিনিময়টাই সব ছিল। আর আজ বড় হয়ে সেই একই জায়গায় দরকার ছাড়া বা কোনও আমন্ত্রন ছাড়া যাওয়া হয় না। অনেক সময় আমন্ত্রনেও যাওয়া হয় না। বিপরীত দিকের অবস্থাও একই। এটাকে অবহেলা ছাড়া কী বলব? আবার এটাও ঠিক, যে সময়ের সাথে সাথে মুখের বদল হয়, নতুন কেউ অনেকখানি জায়গা পায়, প্রায়োরিটি বদলে যায়। আর কিছু পুরোনো সম্পর্ক অজ্ঞাতবাসে চলে যায়।
যাদের সাথে মেলামেশা, তারাও যত্ন করতে পারেনি, পারে না, সবই ক্ষণস্থায়ী বলে মনে হয়। প্রতিটি সম্পর্ককে যতটা যত্ন করা দরকার, পরিচর্যা করা দরকার, আমরা অধিকাংশই সেটা করতে পারি না, হয়ত করিও না । আর পরিচর্যার অভাবে প্রতিটি সম্পর্কই নিয়মরক্ষার উষ্ণতাবিহীন সম্পর্কে পরিনত হয়। ঠিক যেন, প্রয়োজনের তাগিদেই কিছু মানুষের একত্রিত হওয়া, সম্পর্কে আবদ্ধ হওয়া, কিছুকাল একসাথে অতিবাহিত করা, আবার যার যার পথ ধরে একাকীত্বের পথে পা বাড়ানো। বড়ই গোলমেলে গো, বড়ই গোলমেলে।
অনেক বেশি বকে ফেললাম। আর, কাজ না থাকলে যা হয় আর কী! মাথার মধ্যে কত কিছু যে কিলবিল করে বেড়ায়। এতটা পড়ার জন্য ধন্যবাদ দিতেই হবে, কেননা আমাদের মন এতটা সময় একজায়গায় আজকাল আর দাঁড়ায় না। ধন্যবাদ আর শুভ্রাত্রি।