Wednesday, March 11, 2020

কথোপকথন – ২

কথোপকথন – ২ 
....................................

আজ সকালে এক আত্মীয়াকে ট্রেনে তুলে দেওয়ার বিষয় ছিল, সে যাবে জিয়াগাঞ্জ আর আমি যাব ব্যারাকপুর। ঠিক করেছিলাম অফিস যাওয়ার পথে একই ট্রেনে যাব, সে কালীনারায়নপুরে নেমে যাবে আর আমি সোজা চলে যাব ব্যারাকপুর, কিন্তু বাধ সাধল আমার তিন বছরের মেয়ে। সে বলে বসল, 
- বাবা, আমিও তোমার সাথে যাব। 
কান্নাকাটির ঝামেলা না করার জন্য আমি বললাম ঠিক আছে, তাই হবে, তুমিও যাবে। যথারীতি আমরা তিনজন বাইকে যাত্রা করলাম। বুঝে গেলাম আজ আর সঠিক সময়ে অফিস যাওয়া হচ্ছে না, চারদিন পরে অফিস খুলল, তাও আবার লেট। যাইহোক, সেই আত্মীয়াকে ট্রেনে তুলে দিয়ে দিলাম।  

গল্পটি এবার শুরু। প্লাটফর্ম দিয়ে হাঁটছিলাম, আমি আর মেয়ে, একটি ট্রেনের টিকিট পড়ে ছিল। লোকের পায়ে পায়ে নোংরা হয়েছে। মেয়ে বলল, 
- বাবা, এটা কী পড়ে আছে? 
- টিকিট পড়ে আছে মা। 
- কারা ফেলেছে বাবা?
- লোকেরা । 
- কোন লোকেরা বাবা?
- ঐ যারা ট্রেনে করে এখান থেকে কোথাও যায়, বা অন্য কোথাও থেকে ট্রেনে করে এখানে এসেছে, তারা। 

এবার একটু অন্যরকম প্রশ্ন, 
- লোকেরা টিকিট ভালোবাসে না, বাবা ? 
খুব স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর দিলাম, 
- হ্যাঁ, মা, বাসে তো, বাসবে না কেন? 
- তাহলে ফেলে দিয়েছে কেন? 
- আর দরকার নেই বলে। 
এবার আমার অবাক হওয়ার পালা। 
- দরকার না থাকলে কি ভালোবাসতে হয় না, বাবা ? 

একটু চুপ থাকলাম, বললাম, 
- হ্যাঁ, মা, দরকার না থাকলেও ভালবাসা যায়, ভালবাসতে হয়। 
ছোট্ট মানুষের সহজ প্রশ্ন, 
- তাহলে লোকেরা ওগুলো ফেলে দিল কেন? 
- ওগুলোর আর প্রয়োজন নেই মা, ওদের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। 
- প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে ভালোবাসতে হয় না? 
- হ্যাঁ, মা, প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলেও ভালোবাসতে হয়।  যত্ন করতে হয়। 
ছোট্ট মানুষটি কী বুঝলো, কে জানে, সে বলল, 

- ও, তাই? 
- হ্যাঁ, তাই, মা আমার। 
আমরা প্লাটফর্ম পার করে গ্যরেজে চলে এসেছি। বাইকে মেয়েকে বসিয়ে বললাম, তুমি কিছু খাবে মা, 
- না, বাবা, বাড়ি চল, আমি তোমার সাথে স্নান করব। 

বাইক ছুটছে, মেয়ে আয়নায় মুখ দেখছে, আমার মাথায় প্রশ্ন ঘুরছে, আমরা কি সত্যিই প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলেও  ভালোবাসতে পারি? দরকার মিটে গেলেও ভালোবাসতে পারি? নিজেকেই প্রশ্ন করলাম। না, আমিও পারি না, পারি নি,আমার তরফ থেকেও অনেক অবহেলা আছে, যত্নের অভাব আছে, কিছুটা নিজের জগত তৈরি করে সেটাতেই নিজেকে আবদ্ধ রেখে ভাল থাকার চেষ্টা আছে। আমার কাছে এগুলো ভুল বলে মনে হলেও এই অভ্যাস থেকে বেরোতে পারি না। ভয় হয়, না জানি সম্পর্ককে যত্ন নিতে গিয়ে বিপরীত দিকে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি ভেবে না বসে, আবার বুঝি কোনও দরকারে এসেছে। তার চেয়ে এই বেশ ভাল আছি। ভালোবাসাটি মনেই থাকুক সসম্মানে। 

আচ্ছা, আমাদের জীবনে কী সবটা কি দরকার আর প্রয়োজন ভিত্তিক? না , নিশ্চয়ই। ছোটবেলায় পিসি বাড়ি, মাসি বাড়ি, কাকা বাড়ি যেতাম,সকলেই গেছে,  নেহাত ঘুরতে, আনন্দ করতে, কোনও দরকার ছিল না, ভালোবাসা আর আদরের বিনিময়টাই সব ছিল। আর আজ বড় হয়ে সেই একই জায়গায় দরকার ছাড়া বা কোনও আমন্ত্রন ছাড়া যাওয়া হয় না। অনেক সময় আমন্ত্রনেও যাওয়া হয় না। বিপরীত দিকের অবস্থাও একই। এটাকে অবহেলা ছাড়া কী বলব? আবার এটাও ঠিক, যে সময়ের সাথে সাথে মুখের বদল হয়, নতুন কেউ অনেকখানি জায়গা পায়, প্রায়োরিটি বদলে যায়। আর কিছু পুরোনো সম্পর্ক অজ্ঞাতবাসে চলে যায়। 

 যাদের সাথে মেলামেশা, তারাও যত্ন করতে পারেনি, পারে না, সবই ক্ষণস্থায়ী বলে মনে হয়। প্রতিটি সম্পর্ককে যতটা যত্ন করা দরকার, পরিচর্যা করা দরকার, আমরা অধিকাংশই সেটা করতে পারি না, হয়ত করিও না । আর পরিচর্যার অভাবে প্রতিটি সম্পর্কই নিয়মরক্ষার উষ্ণতাবিহীন সম্পর্কে পরিনত হয়। ঠিক যেন, প্রয়োজনের তাগিদেই কিছু মানুষের একত্রিত হওয়া, সম্পর্কে আবদ্ধ হওয়া, কিছুকাল একসাথে অতিবাহিত করা, আবার যার যার পথ ধরে একাকীত্বের পথে পা বাড়ানো। বড়ই গোলমেলে গো, বড়ই গোলমেলে। 

অনেক বেশি বকে ফেললাম। আর, কাজ না থাকলে যা হয় আর কী! মাথার মধ্যে কত কিছু যে কিলবিল করে বেড়ায়। এতটা পড়ার জন্য ধন্যবাদ দিতেই হবে, কেননা আমাদের মন এতটা সময় একজায়গায় আজকাল আর দাঁড়ায় না। ধন্যবাদ আর শুভ্রাত্রি।

Sunday, March 8, 2020

উদযাপন বিতর্ক

উদযাপন বিতর্ক
............................
হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন, ঠিক এই বিষয়টি নিয়েই কিছু বলতে যাচ্ছি। গত কয়েকদিন সোশ্যাল মিডিয়াতে  যা নিয়ে ঝড় বয়ে যাচ্ছে, সেই বিকৃত চর্চা, বিকৃত প্রকাশ, বিকৃত আনন্দ আর বিকৃত উদযাপন। আবার এই বিকৃত শব্দটি নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়, তুমি কে হে বিকৃত বলার? ঠিক কতটুকু নিয়ম ভাঙলে তাকে বিকৃত বলা যায়? এই বিকৃতির সীমারেখাই বা কে নির্ধারণ করবে? স্কুল কলজে পড়া হাজার হাজার শিক্ষিত (?) ছেলেমেয়ে যখন সমবেত ভাবে এই বিকৃতিকেই আনন্দ করে উদযাপন করছে, তখন তাদের মানসিকতা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, রুচিবোধ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে বৈকি। আবার সাথে সাথে এর পাল্টা প্রশ্নও ওঠে, এগুলো ঠিক করার আপনি কে? আমার আনন্দের প্রকাশ কিভাবে হবে, সেটি ঠিক করার আপনি কে? আমার শরীরে আমি কোন শব্দ লিখব, সেটি কি আপনি ঠিক করবেন? সত্যিই তো, আমরা কারা। তাহলে কে প্রশ্ন করবে?  আর যখন বৃহত্তর অংশ সংগঠিত ভাবে ভুল বিষয় উপস্থাপন করে, নিজেদের অসহায়তা সেখানে প্রকট হয়ে পড়ে। কেউ আবার ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্ন তুললে গোলকধাঁধায়  পড়তে হয়। সমস্ত বিষয় তর্কসাপেক্ষ।
কিন্তু বারে বারে কবিগুরুর গান বিকৃত হচ্ছে কেন? যিনি প্রথমবার গানটির মাঝে কিছু গালাগালি যুক্ত করে গেয়েছেন, তিনি অবশ্যই দোষী। তার অনেক ফলোয়ার, তাকে অনেকে সমর্থন করেন । তাকে অনেকে গালাগালি করেন, কেউ বা বলেন তাকে বোঝা নিম্ন বা মধ্যমেধার কাজ নয়। তিনি নাকি সমাজকে নতুন করে প্রতিবাদ করার পথ দেখাচ্ছেন। নতুন ভাষা , নতুন শব্দ, নতুন ভঙ্গী সৃষ্টি করছেন। সত্যিই কি তাই? হবে হয়ত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের বসন্ত উৎসব ঘিরে যে ছবিগুলো সামনে এসেছে, বেশীরভাগ মানুষই তাকে সহজভাবে গ্রহন করতে পারেননি।  না পারারই কথা। আমাদের দীর্ঘদিনের অভ্যাসে যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বসবাস করেন, তার গানের কথার বিকৃতি সহ্য করা সত্যিই কঠিন। আর পাঁচজন কবি-লেখকের সাথে আমরা তাকে একাসনে রাখি না, তিনি স্বকীয়, স্বতন্ত্র। তাই ২৫ শে বৈশাখ, ২২ শে শ্রাবণ আলাদা অনুভূতিতে উদযাপিত হয়। এর ঠিক বিপরীতেও একদল আমরা আছি, যারা মনে করছি, স্বয়ং ভগবানের যখন বিকৃতি হয়, তাহলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাদ যাবেন কেন? ওনার লেখা কি কারও বাপের সম্পত্তি? আমাদের বাক-স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার তুমি কে হে? যেমন ভাবে খুশি গাইব, যে শব্দ আমার পছন্দ হবে সেই শব্দ বসিয়ে গাইব। বেশ, তাই হোক তবে। কিন্তু যেমন খুশি সুর আর যেমন খুশি শব্দ নিয়ে কিছু মৌলিক সৃষ্টির চেষ্টা হলে বেশী ভাল হয় না কি? অন্তত মস্তিষ্কের ভাল ব্যায়াম আর পুষ্টির যোগান হত। কিছু আমাদের এমনও মনে হয়েছে, যারা আজ গান বিকৃতি করেছে, তারাই হয়ত বড় হয়ে রবীন্দ্র-গবেষক হবে, গলা ভারী করে গান-বক্তৃতা করে সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রথম সারিতে থাকবে। খুব স্বাভাবিক। আজ আমরা যারা গেল গেল রব তুলছি, তারাই স্কুল কলেজ জীবনে কত না মজার গান বানিয়েছি, তাতে খারাপ শব্দও ছিল। ক্লাসে বেঞ্চ বাজিয়ে গেয়েওছি। তখন সেটার প্রকাশ ছিল না, প্রচার ছিল না, বন্ধুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। আর নিজেদের কাছেও সেগুলো কখনও অশ্লীল বলে মনে হত না, বরং সেগুলো ছিল এক ধরনের গোপন আনন্দ। মজার বিষয়। আর আজকে সবাই সবার এই মজার বিষয়টিকেই নেটের জন্য জেনে যাচ্ছি আর প্রতিক্রিয়ার বহর বাড়ছে। আর যারা এগুলো করছে, তারাও যে খুব সিরিয়াসলি এগুলো নিয়ে ভেবেছে, তা মনে হয় নয়। তবে আমরা দায়িত্বশীলতা আশা করতেই পারি। তাই নয় কি?
সবচেয়ে কষ্ট পেয়েছে বসন্ত উৎসবের উদ্যোক্তা রা। তাদের উৎসবের আয়োজনের কমতি ছিল না, বিভিন্ন ডিপার্টমেন্ট খুব ভাল পারফর্ম করেছে, অনেক মানুষ প্রশংসা করেছে, কিন্তু সেগুলো কিছুই সেভাবে সাধারন লোকের সামনে আসেনি। একটি ঘটনাকে সামনে রেখে সবকিছুই চাপা পড়ে গেছে। সত্যিই দুঃখজনক।  
এর সাথে ঝড় বয়ে গেল, মালদার চার স্কুল ছাত্রীর আরও হাই ভোল্টেজ ( যদি গালাগালির শ্রেনীবিন্যাস করা হয় ) বিকৃত শব্দের মিশ্রনে গান গাওয়াকে কেন্দ্র করে। এই ঘটনাতেও আমাদের বেশীরভাগ মানুষই নিন্দায় মুখরিত হয়েছে। ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক। এই ভাবে বা এর থেকেও খারাপ ভাবে যে গান গাওয়া হয় না, তা কিন্তু নয়, সমস্যা প্রকাশ করাতে, মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়াতে সৃষ্টি হয়েছে। না জানি এমন কত গান, কত ভাবে প্রতিদিন রেকর্ড হচ্ছে। এটাও হয়ত নিছক মজা করার জন্যই ছিল। এক্ষেত্রেও আমরা একটু দায়িত্বশীলতা, পরিনত মনস্কতা আশা করতে পারি। তারা নেহাত শিশু নয়। আবার আমাদের মধ্যেই কিছু মানুষ বলেছি, এখন মজা করবে না তো, কখন করবে? ওরা যে শব্দে গান গেয়েছে, ওদের মুখে খুব ভাল মানাচ্ছে, লাইফটাকে এনজয় করছে, যারা খুব ভাল হয়, তাদের আর কিছু করা বা হয়ে ওঠা হয় না, এমন আরও কত কথা। ওদেরকে আমরা অনেকে সমর্থনও করেছি। তারা ভুল শুধরে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। কেউ বলেছি, ওরা ভুল করেছে কিন্তু অন্যায় করেনি। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমরা যারা বড়, যারা পিতা মাতা হয়েছি, তারাও আজ বহু ধারায় বিভক্ত। এই ঘটনাগুলো কি একটু হলেও ভাবায় না?
এই সবের মাঝে কিছু আমরা আছি, যারা নির্বিকার শ্রেণীর, সকাল থেকে সন্ধ্যা পয়সার জন্য কাজ করি, সংসার চালাই, ছেলে মেয়েকে পড়াশোনা শেখাই, ঘুমিয়ে উঠে আবার কাজে যাই। কে রবীন্দ্রনাথ, কার গান কে গাইল, কে কোন শব্দ দিয়ে গাইল, কিচ্ছু লেনা দেনা নেই। কী ফেসবুক, কী হোয়াটস অ্যাপ, কার ভুলে সমাজ সংস্কৃতি গোল্লায় যাচ্ছে, আদৌ কোথাও যাচ্ছে না থেমে আছে, বসন্ত উৎসব আবার কারে কয়, চাঁদ কোথায় উঠেছিল, ফেসবুক স্ট্যাটাস কারে কয়, বড় বড় বাতেলা দেওয়া কাকে বলে, কোন বাড়ির মেয়ে কোথায় কিভাবে নাচলো, ভাড়মে যা। প্রতিবাদ?  সেটা আবার কী বস? ভোর চারটেয় উঠে কাজে না গেলে ভাত জুটবে না। ওসব ফেসবুকের প্রতিবাদ নিয়ে তোরাই থাক বস।
(কিছু কথা খারাপ ভাবে লিখে বাকস্বাধীনতা চর্চা করা হল)
জীবনের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করতে যে মানুষগুলো হিমসিম খায়, তাদের একবার জিজ্ঞেস করে দেখো তো কেউ, চাঁদ না উঠলেও তাদের কিছু যায় আসে কিনা ! জিজ্ঞেস কোরো তো, বসন্ত উৎসব মানে কী? ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকবে। জাস্ট ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকবে। তাই লড়াইটা জীবিকার জন্য হোক, বেঁচে থাকার শর্ত পূরনের জন্য হোক, আর প্রতিবাদটা অন্যায় আর অসাম্যের বিরূদ্ধে হোক।